হারিয়ে যাওয়া মোহামেডানীদের সালতামামি…(দ্বিতীয় অংশ)

0
262

এলিস হকঃ অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী ইস্টবেঙ্গল রেলওয়ে দলের কাছে মোহামেডান লীগ বিজয়ের প্রথম বছরেই শীল্ডের খেলায় হেরে যায়। উল্লেখ্য যে, এই লীগে মোট দল ছিল ১১টি। প্রতিটি দলের সঙ্গে দু’বার করে মোকাবেলা করতো। জিতলেই ২ পয়েন্ট। ড্র হলে ১ পয়েন্ট ভাগাভাগি।

কলকাতা ফুটবল লীগে রেলওয়ে দলের যাদুকর সামাদ। ভারতীয় ফুটবল খেলায় প্রথম হিরো ছিলেন এই সামাদ। প্রতিবছর একবার করে ফুটবল খেলা হতো বাছাই করা ইউরোপিয়ান এবং ইন্ডিয়ান দলের মধ্যে। সামাদের বল নিয়ন্ত্রণ ছিল অসাধারণ। ইট ওয়াজ ইম্পোসিবল লং ফুট।

একবার বল ধরলেই একেবারে গোলে প্রবেশ করিয়ে তবেই থামতেন। সেকালের খেলাও ছিল ফুটবল খেলোয়াড়দের নিজস্ব কৌশল দেখবার খেলা। সামাদ যে খুব খেটে খেলতেন, তা তো নয়ই। ২টি গোল করেই তিন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতেন। বল এগিয়ে গিয়েই পাস করে দিতে সতীর্থ খেলোয়াড়ের কাছে। তিনি সাধারণত লেফট আউটে খেলতেন।

এই কলকাতার মাটিতে মোহামেডানের খেলোয়াড়েরাই সর্বপ্রথমে ২-৩-৫ পদ্ধতিতে ছোট পাস দিয়ে ফুটবল খেলার শুভ সূচনা করে। ২ জন লেফট ব্যাক (চার্জিং) এবং অন্যজন রাইট ব্যাক (ফ্রি)। ৩ জন সেন্টার হাফ। তাঁর দুইপাশে রাইট হাফ ও লেফট হাফ। ৫ জন সেন্টার ফরোয়ার্ড। ঐ সেন্টার ফরোয়ার্ডের দুইপাশে ৪ জন খেলোয়াড়। রাইট ইন ও রাইট আউট এবং লেফট ইন ও লেফট আউট। এই ২-৩-৫ পদ্ধতিই ছিল সবচেয়ে আক্রমণাত্মক পজিশন।

ঐ ত্রিশ দশকে বেস্ট অব দ্য বেস্ট পজিশন। পজিশনের ধারা অব্যাহত সত্তর দশক পর্যন্ত ছিল। তুলনামূলক বিচারে এই পদ্ধতির আচরণ ছিল পজিটিভ। পজিটিভের সুবাদে খুব সহজে গোল করা যায়। কড়ায়-গন্ডায় বেশি গোলও হয়। কলকাতার গর্ব মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব পজিশনটি বেছে নেয়।
ঐ পদ্ধতির পক্ষে দুই ব্যাকদ্বয়দের একটি সুবিধা ছিল। দায়িত্ব ছিল প্রতিপক্ষের আক্রমণগুলো

নস্যাৎ করা।

গোলসীমানার মধ্যে এসেও গোলরক্ষার কাজে নেমে যেতেন। একজন লেফট ব্যাক প্রতিপক্ষের একজন সেন্টার ফরোয়ার্ডকে কড়া পাহারায় রেখে খেলেন এবং আরেকজন রাইট ব্যাক শুধু ফ্রি হয়ে খেলেন। এমনকি মার্কিং করতে গিয়ে ছায়া খেলোয়াড়টি রাইট ব্যাকে দৌড়ে ছুটে যেতো ঐ ম্যানকে ধরার জন্য। পরিস্থিতির অনুকূলে না হলে রাইট ব্যাক নিজেই চার্জিং করার দায়িত্বও নিতো।

লেফট ব্যাক মুহূর্তেই হয়ে যেতেন ফ্রি অথবা বলের প্রতি লক্ষ্য রেখে। খেলোয়াড়দের ক্যাচিং করতে তীক্ষ্মও নজর রেখে ঐ খেলোয়াড়টি খেলতেন। এরকম জুটিদ্বয় পাওয়া তখনকার যুগে ছিল কঠিন আর বোঝাপড়ায় সুসম্পর্ক পাওয়া রীতিমতো দুঃসাধ্য। যা আজকের যুগে বর্তমান প্রজন্মের ফুটবল খেলোয়াড়েরা অতশত বুঝতে সক্ষম নয়।

সুতরাং কলকাতার মাঠে সন্দর্পের মতো ফুটবল খেলে গেছেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের দুই ব্যাক জুম্মা খাঁ ও শফি। এই জুটিদ্বয় বিপক্ষের সেন্টার ফরোয়ার্ডের আক্রমণগুলোকে বহুবার নস্যাৎ করে দিয়েছেন।

নূর মোহাম্মদ সেন্টার হাফে খেলতেন। বল পেয়েই তিনি এগিয়ে গিয়ে পৌঁছে দিতেন নিজেদের দলের সতীর্থ রাইট হাফের কাছে। কিংবা লেফট ব্যাককে বল দেয়ার। মোহামেডানের ২ জন যোগ্য-দক্ষ খেলোয়াড় সেন্টার হাফের দু’পাশে ২ জন লেফট-রাইট হাফের মাসুম ও নাসিম।

ঠিক একইভাবে বল ধরে প্রান্তবদল করে একটু এগিয়ে এসে উপরের দিকে বল টোকা দিয়ে দিতেন। তা ঐ নিজেদের দলের সেন্টার ফরোয়ার্ড কিংবা রাইট ইন ও রাইট আউট। ঐ সেন্টার হাফের খেলোয়াড়ের উদ্দেশ্য নিয়ে লেফট ইন ও লেফট আউটের কাছে বল পাস করতেন। আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার ধার তীক্ষ্ম করতে ২-৩-৫ পদ্ধতি ছাড়া কলকাতা মোহামেডানের সামনে অন্য কোনো বিকল্প কৌশল খোলা ছিল না।

৫ জন খেলোয়াড়েরা প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগে জোরালো করতে ভীতির রাস্তা ধরে ফুটবল খেলায় খেলতেন। এটাই ছিল উপযোগী ও ম্যাচ জেতার প্রধান কৌশলের মোক্ষম অস্ত্র।

নির্দিষ্ট পজিশনে নির্দিষ্ট ফিল্ডে গিয়ে জায়গা বের করা চাট্টিখানি কথা নয়। ডি বক্সের কোনাকুনি জায়গায় গিয়ে রাইট ইন ও লেফট ইন ছুটে যেতেন। ঠিক একই সময়ে অন্যদিকে বল ছাড়াই দুই কর্ণার পতাকার ধারে কাছে রাইট আউট ও লেফট আউট ছুটে যেতেন।

পেনাল্টি বক্সে বা পেনাল্টি কিক স্পটের উপর মুভমেন্ট নড়াচড়া করে যাবেন লেফট ইন বা রাইট ইনের কাছ হতে বল পাওয়ার প্রতীক্ষায়। তা যদি সঠিক হয় তবে সেই সেন্টার হাফ খেলোয়াড় উঠে যেতো গোল দেয়ার জন্য আর তাতেই গোল হয়ে যেতো।

প্রতিপক্ষের গোলপোস্টের ভেতরে বল জড়িয়ে দিতে সে কী আনন্দ! ঐ সব খেলোয়াড়েরা উদযাপন করতেন। এই ছিল তখনকার সময়ে ভারতীয় দলের একটি ক্লাবের নিজস্ব ঘরাণাগত আদর্শ ফুটবল খেলার চমৎকার নমুনার ইতিহাস!

(বাকি অংশ তৃতীয় পর্বে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here