হারিয়ে যাওয়া মোহামেডানীদের সালতামামি…

0
360

এলিস হকঃ ঢাকা স্টেডিয়াম থেকে আবদুল হামিদ….
এবং একই সঙ্গে আমার সাথে আছেন খোদা বক্স মৃধা…মঞ্জুর হাসান মিন্টু…নুর আহমেদ…।

আজ চিরস্মরণীয় বিশেষ দিন। মোহামেডান বনাম আবাহনীর মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ খেলায় আমরা আপনাদের সাথে থাকবো আশা করি।

ইতিমধ্যে  উভয় দলের খেলোয়াড়বৃন্দরা মাঠে প্রবেশ করেছেন; সুন্দরভাবে তাদের অভিবাদনের মধ্যদিয়ে দর্শকরা স্বাগত জানিয়েছেন।

বিশেষ করে আজকে আমরা আপনাদের সামনে এমন কিছু বলতে চাই। স্মৃতি বিজরিত দুই জনপ্রিয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহামেডান-আবাহনীর খেলা নিয়ে কিছু একটা বলার প্রয়াস পাচ্ছি। আপনাদের কাছে এমন ঘটনা বলা উচিত..যেথায় বাংলাদেশের একটা সময় স্বর্ণযুগের দিন ছিল।

ফার্স্ট ফ্ল্যাশব্যাক : কয়েক সেকেন্ড নীরবতা। সারা মাঠ যেন প্রেতপুরী! কিছু বোঝার আগেই সাব্বির স্বপ্রতিভায় নড়ে চড়ে ওঠেন। তিনি ইঁদুর গতিতে সাইড লাইন ঘেঁষে ঢুকে পড়েন। ডানদিকে প্রতিপক্ষের বক্সে। তাঁর পায়ে পায়ে লেগেই ছিল বল। আঠার মতো যুক্ত। কর্ণার ফ্ল্যাগের কাছে। সাব্বির লব করতে গিয়ে থেমে যান। সামনে জনি। সাব্বির ঐ এমিলিকে চিপ করেন। এমিলি থেকে জনি। জনি থেকে এমিলি। সাব্বির চলন্ত বলের উপর বুটের আগায় খোঁচা দিয়েছেন। কর্কের মতো বল উড়ে গেছে ডি-বক্সের উপর।

কিন্তুগোলকিপার মহসিন বাঘের মতো গোঁজ মেরে ওৎপেতে ছিলেন। তাঁর লক্ষ্য বলের ফ্লাইট বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়া। বক্সের অন্যত্রে দাঁড়িয়েছিলেন বিগ হাইট এমেকা। দারুণ আন্ডারস্ট্যান্ডিং ছিল সাব্বির আর এমেকার মধ্যে। বল এড় আসছে দেখে পাকির আলী লাফিয়ে উঠার প্রস্তুতি নিয়েছেন। কিন্তু বলের সুইং শার্প হওয়ায় পাকির আলী ফেল করেন। বল ফাঁকায় এসে পড়ে সোজা এমেকার বুকে। বুক থেকে বল নামিয়ে চোখের পলকে ডান পায়ে চূড়ান্ত শট হাফভলি মেরেছেন। মহসিন ফার্স্ট বার দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সেকেন্ড বার দিয়ে জেট স্পিডে ঢুকে গেছে ‘ডাইরেক্ট ইন টু গোলনেটস’!

তারপর?

দারুণ এক অবিস্মরণীয় চিৎকার! ঢাকা স্টেডিয়ামের উত্তর দিকটা তুবড়ি বাজির মতো উল্লাসে ফেটে পড়ে। দক্ষিণ দিকে কবরখানার মতো পুরোপুরি নিস্তব্ধ। সবার রক্ত চলাচল বন্ধ। নড়ে না, চড়ে না-এমন শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা! না, প্রিয় পাঠকমন্ডলী, এটা প্রকৃত বাস্তব ঘটনা নয়। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের একজন ঘোর সাপোর্টারের কল্পনা কুসুম চিত্র।

সেকেন্ড ফ্ল্যাশব্যাক : মোহামেডানের কাউন্টার এ্যাটাকে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স কিছুটা রণে ভঙ্গ হয়ে পড়ছে। জসির স্পিডের নিকট মুন্না ফেল। জসি কাট করে ডি-বক্সে উঠে আসছেন। এক্সপ্রেসের মতো এগিয়ে এসে পাকির আলী ট্যাকেল করতে যান। জসি তাকেও ডজ করেন। এরই ফাঁকে মুহূর্তে জটলার সৃষ্টি হয়। ফিনিশিং এন্ডে পাকির আলী ত্বড়িৎ বেগে বল টোকা দিয়ে বের করে দেন। বাঁজপাখির মতো শামির সাকির বলকে ছোঁ মেরে নিয়ে যান। একদমে লং স্যুইপ। আশিষ ভদ্র বাঁ পায়ে রিসিভ করে এদিক-ওদিক তাকিয়েছেন। তিনি খেলোয়াড়দের অবস্থান দেখে নিয়েছেন। রাইট ব্যাক মুন্না লাইন ধরে বল ধরতে উইদাউথ রানিং দৌড়ে গেছেন। আশিষ ভদ্র দেখার মতো এ্যান্টিসিপেশনরূপে খেলছেন। আগুয়ান মুন্নার কাছে বল কাৎ করে আশিষ ভদ্র ছেড়ে দিয়েছেন।

মোহামেডানের কামাল ট্যাকেল করার আগেই মুন্না বল উঠিয়ে মেরে দেন, একেবারে করিম মোহাম্মদের মাথায়। বলটি ছিল নিখুঁত টাইমিং সেন্স। দারুণ টনটনে। গোলকিপার কাননকে ডানে রেখে বাঁয়ে জালের মধ্যে বল প্রবিষ্ট করিয়ে দেন। ঢাকা স্টেডিয়ামের দক্ষিণ দিকে ঝঞ¦া-ক্ষুব্ধ সমুদ্রের মতো অজান্তেই ভেঙে পড়ে। উত্তর দিকে অনঢ়, বিমূঢ়! সবার বুক ফেটে চৌচির। না, সুপ্রিয় পাঠকমন্ডলী, এটাও সত্যি ঘটনা নয়। আবাহনী ক্রীড়াচক্রের (বর্তমান আবাহনী লিমিটেডে রূপান্তরিত হয়েছে) এক অন্ধ সাপোর্টারের স্বপ্ন।
শ্রোতাবন্ধুরা আমরা এখন খবরের জন্য স্টুডিওতে ফিরে যাচ্ছি..খবর শেষ হওয়া মাত্রই আমরা স্টুডিওতে ফিরে আসবো..চলুন স্টুডিওতে…

হাজার হাজার দুই গোষ্ঠীর সাপোর্টার বিদ্যমান ছিল তখনকার বাংলাদেশে। একদিকে আবাহনী ক্রীড়া চক্র এবং অন্যদিকে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব। এই দুটি চির প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দীর্ঘদিন চিহ্নিত হয়ে আসছে। ১৯৩৬ সালে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব মুসলিম জাগরণের ক্ষেত্রে জন্মলাভ করে। স্বাধীনতার ৩৬ বছর পর আবাহনী ক্রীড়া চক্র বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে উদিত হয়। ১৯৭২ সালে আধুনিক ফুটবলের জন্ম দিয়েই শুরু। এক কথায় উদ্ভাসিত কন্ঠে লেখা যায়-একদিকে ঐতিহ্য গর্বিতধারী ঢাকা মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব এবং অন্যদিকে সদ্যজাত শিশু আবাহনী ক্রীড়া চক্র।

১৯৭২ সালে দুটি দলের মধ্যে পরস্পরের ফুটবল মাঠে মুখোমুখি হয়। সেটা ছিল-ঢাকা প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগের ফার্স্ট সেশনে। ১ম খেলায় আবাহনীর জয় দিয়ে যাত্রা শুরু করে। বলা বাহুল্য আবাহনী ২-০ গোলে জেতে।

অমলেশ সেন এবং কাজী সালাহউদ্দিন সর্বপ্রথম গোলদাতাদ্বয় হিসেবে ঠাঁই পেয়ে যান। প্রথম গোলের বিবরণ ছিল : মোহামেডানের স্টপার পিন্টুর ভুলে। তিনি ব্যাক পাস করে গোলকিপারকে গিয়েছিলেন। সেই সুযোগে অমলেশ সেন বল কেড়ে নেন। ডাইরেক্ট ওপেন হিট!

আবাহনীকে কাজী সালাহউদ্দিন দ্বিতীয় গোল পাইয়ে দেন, একটি মুভমেন্ট এ্যাটাক জোন থেকে। কাজী সালাহউদ্দিনের প্রত্যুৎপন্নমতি দেখে অনেক যোদ্ধা দর্শক সেদিন মন্তব্য করেছিলেন-‘ছেলেটি পরবর্তী ঢাকার মাঠে বাঘের মতো গর্জে উঠবে।’

১৯৭৬ সালে রিটার্ন লীগ। খেলার পরও পরবর্তী না খেলে আবাহনীর পক্ষে ওয়াকওভার লাভ। মোহামেডানের মেজর হাফিজের দেয়া ২-০ গোলে এগিয়েছিল। কিন্তু বিধিবাম! খেলারই এক পর্যায়ে খেলোয়াড়দের গোলেমালে গন্ডগোল বেঁধে যায়। বাফুফে স্বগর্বে (?) ঘোষিত কণ্ঠ ঝরে-‘ইট হ্যাজ ডিকলারেশন টু ড্যামেজড ইন দ্য প্লে’। নেক্সট ম্যাচেস এ্যাবসেন্ট ওয়াজ মোহামেডান। নট প্লে! কারণটা সম্পূর্ণ অজ্ঞাত রহস্য।

ফলশ্রুতিতে, আবাহনীর পকেটে আসে ওয়াকওভারের বোনাস।

১৯৭৪ সালে সারা সিজনে মাত্র একবারই লীগ পর্বে ঘটেছে। লীগের ফার্স্ট সেশন। মোহামেডান ১-২ গোলে পরাজিত হয়। আবাহনীর পক্ষে গোলদাতা নান্নু। তিনি পেনাল্টি কিক থেকে গোল পান। পেনাল্টিতে দুই দলের মধ্যে আবাহনীই প্রথম সাক্ষী।

গফুরের জোড়া পা হতে দ্বিতীয় গোল আসে। যার গতি দেখে আবাহনীর এক ভক্ত দর্শকরা আদর করে নাম দিয়েছিলেন-‘ঐ স্কুটার ভাই’। মোহামেডানের পক্ষে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটান ঐ বাংলাদেশ জাতীয় দলে চান্স না পাওয়া মেজর খ্যাত হাফিজ উদ্দিন ওরফে হাফিজ।

ইতিহাস বলছে……১৮৯১ সালে ভারতবর্ষের মাটিতে আলাদা মুসলিমদের নিয়ে কলকাতায় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৮৯২ সালে ভারতীয় ফুটবল এসোসিয়েশন সংগঠিত হয়। ১৮৯৩ সালে আইএফএ (ইন্ডিয়া ফুটবল এসোসিয়েশন) শীল্ডের খেলা শুরু হয়। অবশ্য আইএফএ শীল্ড পূর্বে ‘ট্রেডস্ কাপ’ই ছিল সমগ্র ভারতবর্ষের একমাত্র ফুটবল প্রতিযোগিতা।

(চলবে) প্রথম অংশ…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here