রূপকথা লেখা না হলেও ভারতের ‘গর্বিত’ হার

0
323

সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ২ ( মুবারক , মবখউত ) – ভারত ০

কলকাতা প্রতিনিধি: “অভাগা যেদিকে চায় সাগর শুকায়ে যায়” , সুনীলদের একের পর এক গোল নষ্টের প্রতিযোগিতা দেখতে দেখতে বহুল ব্যবহারে ক্লিশে হয়ে যাওয়া এই উক্তিটিই মাথায় আসছিল । এ যেন ক্ষুদ্র অসহায় মানবের সঙ্গে নিষ্ঠুর অদৃষ্টের অসম খেলা । ম্যাচ শেষে প্রীতম-সন্দেশদের যন্ত্রনাক্লিষ্ট মুখ গুলো দেখে কষ্টই হচ্ছিল । ভাগ্য আজ একটু সদয় হলে হয়তো এই মুখগুলোই বদলে যেত উজ্জ্বল বর্ণিল সাফল্যের আলোকজ্জ্বল হাসিতে । কলকাতা থেকে কোচি , গোয়া থেকে গুয়াহাটির সমস্ত পাব ও রেঁস্তোরাতে রাত জেগে টিভির সামনে বসে থাকা শত শত তরুণ তরুণীর মুখগুলোয় হয়তো জ্বলে উঠতো হাজার ওয়াটের আলো ।

তাঁদের বল্গাহীন আবেগের উচ্ছ্বাসে হয়তো জেগে উঠত ঘুমন্ত শহর । হয়তো এই মাঝরাতের শুনশান জনমানবহীন রাজপথে গতির তুফান তুলে বিজয় মিছিল বের করত কোনো অজ্ঞাত অখ্যাত ফুটবল অন্ত প্রাণ ফ্যান ক্লাবের সদস্যরা । কিন্তু এসব এখন শুধুই কল্পনা । বাস্তবে আজ যা হওয়ার ছিটেফোঁটা কোনো সম্ভাবনা নেই । তবু এ হারে হতাশা নেই গর্ব আছে ; লজ্জা নেই লড়াই আছে । তবুও ৯০ মিনিটের জীবন বাজি রাখা লড়াই , আরব আমিরশাহির চোখে চোখ রেখে কথার বলার ধৃষ্টতার এহেন করুণ পরিনতি যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ব্লু টাইগার্সের যোদ্ধারা । তর্কাতীত ভাবে ৪-১ ব্যবধানে জেতা থাইল্যান্ড ম্যাচের থেকেও আজ সুনীলদের খেলায় ছিল অনেক বেশি শৃঙ্খলা , আক্রমন ও বুদ্ধিমত্তার মিশেল । অবিসংবাদিত ফেভারিট আমিরশাহির সামনে যে ম্যাচে খড়কুটোর মতো উড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল কে ভেবেছিল সেই ম্যাচই আরব দৈত্যদের জন্য এতোটা কঠিন করে তুলবেন সুনীলরা ।

ম্যাচ শুরুর আগেই কোচ স্টিফেন কনস্ট্যানটাইন বলেছিলেন আজ আমক্রনই হবে তাঁর মূলমন্ত্র । ম্যাচেও দেখা গেল গুরুর কথাই বেদবাক্যের মত পালন করলেন সুনীল উদান্তরা । এদিন প্রথম থেকেই আক্রমনের পর আক্রমন তুলে এনে আমিরশাহি ডিফেন্সকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল ভারত ।

প্রথমার্ধে পাওয়া তিনটি সোনার সুযোগ এদিন হেলায় হারালেন সুনীলরা । ম্যাচের ১৫ মিনিটে সুনীলের ডিফেন্স চেরা ঠিকানা লেখা থ্রু ধরে আশিক কুরুনিয়ানের শট আমিরশাহি গোলকিপারের হাতের সামান্য স্পর্শ করে বাইরে বেরিয়ে যায় । দ্বিতীয় পোস্ট ফাঁকা পেয়েও আশিক কেন প্রথম পোস্টে শটটি নিলেন তা তিনি নিজেই ভালো জানেন । কিছুক্ষন পরেই অনিরুদ্ধর কর্ণার থেকে সুনীলের জোরাল হেড বিপক্ষ গোলকিপারের গায়ে প্রতিহত হয় । এর মধ্যেই ম্যাচের প্রথম গোলটি তুলে নেয় আরব আমিরশাহি । কাউন্টার অ্যাটাক থেকে মুবারকের কোনাকুনি নেওয়া শটে এগিয়ে যায় তাঁরা । মুবারক এই গোলের জন্য অবশ্য ডিফেন্ডার আনাসকে একটি ধন্যবাদ দিতেই পারেন । কারন তাঁর দৌড়াতে ক্ষনিকের দেরি হওয়ায় এতোটা ওপেন স্পেসে ফাঁকায় গোল করে গেলেন মুবারক । প্রথমার্ধের খেলার একেবারে অন্তিম পর্বে ম্যাচে সমতা ফেরানোর সুযোগ এসেছিল ভারতের কাছে । কিন্ত ভাগ্য বিরূপ । ফাঁকা গোলে সুনীল বল ঠেলে দিলেও তা পোস্টের কয়েক ইঞ্চি বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায় ।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে যেন আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠে আরব আমিরশাহি । তবে তার মধ্যেও যে ভারত গোলের সুযোগ পায়নি তা নয় । উদান্তর শট লাগে ক্রসবারে , জেজের শট কানঘেঁষে বেরিয়ে যায় পোস্টের ওপর দিয়ে । এক এক সময় মনে হচ্ছিল ভারতের প্রতিপক্ষ কী সত্যিই আরব আমিরশাহি নাকি নিয়তি । নাহলে এহেন পাঁচ পাঁচটি ঐকান্তিক চেষ্টার এমন বিফল পরিনতি? একটাও জালে জড়াল না?

আয়োজক দেশ হওয়ায় আজ গ্যালারিতে আরব সমর্থকই ছিল বেশি । তবে তার মাঝেও যে গুটিকয়েক ভারত সমর্থককে এদিন দেখা গেল দ্বিতীয়ার্ধের অন্তিমক্ষনে দেখে মনে হল একেবারেই মুষড়ে পড়েছেন । যেন অস্ফুটে বলছেন মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই চলে , অদৃষ্টের বিরুদ্ধে নয় । ৮৮ মিনিটে আলি মবখউতের গোল তাঁদের টিমটিম করে জ্বলা আশার সলতেটাকে একেবারেই নিভিয়ে দেয়।

আজ জয়ের বন্দরে নোঙর ফেলতে পারলেই নক আউটের টিকিট নিশ্চিত করে নয়া রূপকথা লিখতে পারতেন সুনীলরা । কিন্তু সুযোগ নষ্টের প্রদর্শনী ও কিছুটা ভাগ্য বিরূপতা তাঁদের আজকের এই ঐকান্তিক চেষ্টাকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করল । এখন সোমবারের বাহরিন ম্যাচে সেই মাহেন্দ্রক্ষনের অপেক্ষায় থাকতে হবে সুনীলদের ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here