বিশ্বকাপ ক্রিকেটে শ্রীংলকা

0
41

শ্রীংলকার ক্রিকেট ইতিহাস বেশ পুরোনো। প্রথমে তারা সাইলন ক্রিকেট দল হিসেবেই ক্রিকেটে পথচলা শুরু করে। ১৯৬৫ সালে সাইলন ক্রিকেট দল হিসেবে আইসিসির সদস্যপদ লাভ করে। ১৯৭২ সালে নাম পরিবর্তন করে শ্রীংলকা হয়। শ্রীংলকা ক্রিকেটের সাথে দেশটির রাজনীতি বেশ ভালোভাবে জড়িত। অন্যকোনো দেশে এমন দেখা না গেলেও তাদের দেশে এমনটা দেখা যায়। তাদের ক্রিকেট বোর্ড এককথায় তাদের ক্রীড়ামন্ত্রী পরিচালনা করে। ১৯৭৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ খেলে দ্বীপদেশটি। এখন পযর্ন্ত ৮৩৮ ওয়ানডে খেলেছে শ্রীংলকা যেখানে তাদের জয় ৩৮০টি হার ৪১৬টি ৫টি ম্যাচ ড্র হয়েছে ফলাফল হয়নি ৩৭টি ম্যাচে।

ক্রিকেট বিশ্বকাপে কিছুটা ভাগ্য খারাপ তাদের বলতেই হয়। ১৯৭৫ বিশ্বকাপ দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাস শুরু। ইংল্যান্ডের এই বিশ্বকাপে তারা প্রথম পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিলো। এইভাবে ১৯৭৯, ১৯৮৩, ১৯৮৭ এবং ১৯৯২তে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপ থেকেও প্রথম পর্বে বিদায় নেয় দেশটি। ১৯৯৬ সাল যে তাদের বিশ্বকাপ হবে এটি কেউ কল্পনাও করেনি। ১৯৮৩ সালে তাদের দেশে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। এই যুদ্ধের কারনে পিছিয়ে পরে দেশটি তেমননি ভাবে পিছিয়ে পরে তাদের ক্রিকেটও। তাদের দেশে গৃহযুদ্ধ ২০০৯ সাল পযর্ন্ত চলে। কিন্তু এর মাঝে বড় পরিবর্তন আসে ১৯৯৬ বিশ্বকাপে। কারন সবাইকে অবাক করে দিয়ে নিজেদের দেশে বিশ্বকাপ নিয়ে আসে শ্রীংলকা। ১৯৯৬ সালে বিশ্বকাপের আয়োজক ছিলো ভারত, পাকিস্তান এবং শ্রীংলকা। ৩দেশের প্রায় ২৬টি ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয়েছিলো ১৯৯৬ সালে বিশ্বকাপ। ১৯৯৬ সালে শ্রীংলকাকে নেত্বতৃ দিয়েছিলেন আরজুন রানাতুঙ্গা। এছাড়াও কুমার ধারমাসেনা, জয়সুরিয়া, মুরুলিধরন, চামিন্দা বাস, রাসেল সহ আরো কিছু ভালো মানের ক্রিকেটার। যারা সবাইকে অবাক করে দিয়ে বিশ্বকাপ নিজেদের ঘরে তুলে। সবাই ধারনা করেছিলো বিশ্বকাপ অস্ট্রেলিয়া বা ভারতের হাতেই উঠবে। ১৯৯৬ সালে বিশ্বকাপে দুইটি গ্রুপ ছিলো। গ্রুপ এ তে ছিলো শ্রীংলকা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, জিম্বাবুয়ে এবং কেনিয়া। সবাইকে গ্রুপ পর্বই জানিয়ে দেয় শ্রীংলকা সহজ দল নয়। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে পরবর্তী পর্বে উঠে দেশটি। তাদের প্রথম ম্যাচ অস্ট্রেলিয়া সাথে ছিলো ভারতের বম্বেতে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট টিম ম্যাচটিতে অংশগ্রহন করেনি নিরাপত্তা জনিত কারনে এই জন্য না খেলেই জয় পায় শ্রীংলকা। ২১ ফেব্রুয়ারী দ্বিতীয় ম্যাচ ছিলো জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ২২৮ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ৬ উইকেটে জয় পায় শ্রীংলকা। এরপরের ম্যাচ ছিলো কলোম্বতে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। কিন্তু গৃহযুদ্ধের কারনে ক্যারিবিউরাও ম্যাচটি খেলতে রাজি হয়নি তাই জয় পায় শ্রীংলকা। অস্ট্রেলিয়া ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ন ৬টি পয়েন্ট পায় তারা। বড় জয় আসে ভারতের বিপক্ষে। ভারতের মাটিতে ভারতকে হারনো ছিলো খুবই কঠিন। শচীন, কুমলেরা ছিলো নিজেদের সেরা সময়ে। ম্যাচটি ছিলো ভারতের দিল্লিতে। টসে জিতে বোলিং নেন শ্রীংলকার অধিনায়ক রাগাতুঙ্গে। ভারতের মাটিতে চিরচেনা শচীনের সামনে টিকতেই পারিনি লংকান বোলাররা। ১৩৭ বলে ১৩৭ রানের ইনিংস খেলেন ক্রিকেটের ঈশ্বর। আর ভারত অধিনায়ক আজারউদ্দিন খেলেন ৭২ রানে ইনিংস। এতে করে শক্তিশালী ভারত ২৭১ রানের বড় পুজি পায়। শ্রীংলকার ব্যাটিং এর ভরসা ছিলো জয়সুরিয়া। ওপেনিং এ নেমে ৭৯ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। কিন্তু কেউ ভালো সঙ্গ দিতে পারেনি। শেষে তিলাকনারাত্তের ৭০ রান এবং অধিনায়কের ৪০ রানের উপর ভর করে ভারতের বিপক্ষে জয় তুলে নেয় শ্রীংলকা। এই জয়ই তাদের আত্মবিশ্বাস দেয় যে তারা বিশ্বকাপ জিততে পারবে। নিজেদের শেষ ম্যাচ তারা কেনিয়ার বিপক্ষে খেলে। ম্যাচটিতে ডি সিলভার ১৪৫ রানের ইনিংসে ৩৯৮ রানের বিশাল পুজি পায় লংকানরা। তারা ১৪৪ রানে ম্যাচটি জেতে। ২০০৬ সাল পযর্ন্ত ৩৯৮ রানটি বিশ্বকাপে কোনো দলে সর্বোচ্চ দলীয় রান ছিলো। নকআউট পর্বে তারা মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ডের সাথে। ম্যাচটি ৫ উইকেটে জেতে তারা। ভারতকে সেমিফাইনালে পাত্তাই দেয়নি দেশটি। ২৫১ রানে টার্গেটে ব্যাট করতে নামলে ১২০ রানে ৮উইকেট হারিয়ে বসে ভারত। এতেই কলকাতা ইডেন গার্ডেনের সমর্থকরা মাঠে বোতল ছুড়ে মারতে থাকে এবং খেলা বন্ধ হয়ে যায়। পরে শ্রীংলকাকে জয়ী ঘোষনা করা হয়। ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় পাকিস্তানের লাহোরে। ২৪১ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে মাত্র ৩উইকেট হারিয়ে জয় তুলে নেয় শ্রীংলকা। এতে করেই নিজেদের প্রথম আর একমাত্র বিশ্বকাপ ঘরে তুলে তারা। বিশ্বকাপ জয়টি তাদের দেশের গৃহযুদ্ধ বন্ধ করে দিয়েছিলো বেশকিছুদিনের জন্য। পুরো জাতিকে একত্রিত করে তুলেছিলো ক্রিকেট। ১৯৯৯ বিশ্বকাপ আবারো তাদের খারাপ গিয়েছে। গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়ে দেশটি। কিন্তু ২০০৩ সালে আবারো পুরোনো রুপে ফেরে তারা। সেমিফাইনাল খেলে ২০০৩ বিশ্বকাপে। ২০০৭ এবং ২০১১ বিশ্বকাপ তাদের জন্য ভাগ্য খারাপের বিশ্বকাপ ছিলো। দুইবার ফাইনালে গিয়ে হারতে হয় দেশটিকে। দুইবারই রানারআপ। ২০০৩ সালে হারে অস্ট্রেলিয়ার কাছে আর ২০১১ সালে ভারতের কাছে। সর্বশেষ ২০১৫ সালে বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোয়াটার ফাইনাল থেকে বিদায় নেয়।

২০১৯ বিশ্বকাপের শ্রীলঙ্কা দল

দিমুথ করুনারত্নে (অধিনায়ক), লাসিথ মালিঙ্গা, অ্যাজেলো ম্যাথিউস, থিসারা পেরেরা, কুশল পেরেরা, ধনঞ্জয় ডি সিলভা, কুশল মেন্ডিস, ইশুরু উদানা, মিলিন্দা শ্রীবর্ধনে, অভিষেক ফার্নেন্ডো, জীবন মেন্ডিস, লাহিরু থিরিমান্নে, জেফরি ভেন্ডারসে, নোয়ান প্রদীপ, সুরাঙ্গা লাকমাল।

১৫ সদস্যদের দলটিতে অভিজ্ঞ এবং তরুন দুইধরনের খেলোয়ার রয়েছে।

যারা হতে পারেন লংকানদের তুরুপের তাস

অ্যাজেলো ম্যাথিউস

সলংকান দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ক্রিকেটার তিনি। ১৯৮৭ সালে ২জুন জম্মগ্রহন করেন এই অলরাউন্ডার। ৩১ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে শ্রীংলকার হয়ে অভিষেক হয় তার। এখন পযর্ন্ত ২০৫ ম্যাচ খেলেছেন তিনি। রান করেছেন ৫৩৮১ শতক আছে ২টি অর্ধশতক করেছেন ৩৭টি। উইকেট আছে ১১৪টি। দলটির অধিনায়কও ছিলেন এবং ২০০৮ এর পর তিনি নিয়মিত সদস্য শ্রীংলকা দলের। দীর্ঘ ১০ বছর জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন তিনি। বিশ্বকাপে তার অভিজ্ঞতা এবং অলরাউন্ড পারফম্যান্স শ্রীংলকা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ন।

লাসিথ মালিঙ্গা

৩৫ বছর বয়সী এই পেস বোলারের এই শেষ বিশ্বকাপ। দক্ষিন এশিয়ার সেরা বোলারদের একজন মালিঙ্গা। ওডিআই অভিষেক হয়েছিলো ২০০৪ সালে। ২১৮টি ওডিআই খেলেছেন এখন পযর্ন্ত। উইকেট আছে ৩২২টি। ৫ উইকেট নিয়েছেন ৮বার। তার গতি অভিজ্ঞতা যেকোনো দলের জন্য কঠিন হতে পারে।

থিসারা পেরেরা

পেরেরা লো-অর্ডারে ব্যাটিং করে দলকে যেতানোর সামর্থ্য রাখেন। শ্রীংলকাকে অনেক ম্যাচ জেতানোর কারিগর এই অলরাউন্ডার। ২০০৯ সালে ভারতের বিপক্ষে অভিষেক হয় তার। এখন পযর্ন্ত ১৫৫টি ওডিআই খেলেছেন। রান করেছেন ২১৭৪ শতক আছে একটি অর্ধশতক ১০টি। উইকেট নিয়েছেন ১৭০টি। তার অলরাউন্ড পারফম্যান্স যে শ্রীংলকা দলকে যেকোনো কঠিন ম্যাচ জেতাতে পারেন।

লিখেছেনঃ কামরান মাহামুদ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here