বিলেত বলেই বিরাটদের নিয়ে আশা বেশি

0
66

বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে বিরাটদের নিয়ে ফিচার লিখতে বসে এর থেকে যুতসই শিরোনাম আর খুঁজে পাচ্ছি না | অনেকে হয়তো গত কয়েক বারের ইংল্যান্ড সফরে ভারতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলতে পারেন যে দলটার গতবছরও বিলেতে টেস্ট সিরিজ খেলতে এসে জমানত বাজেয়াপ্ত হল তাঁদের নিয়ে এতো আশার আলো দেখছেন কী করে? দেখছি এ জন্যই যে সাদা পোষাকে বিরাটদের বিদেশ বিভুঁইয়ে যতই ভাঁড়ে মা ভবানী অবস্থা হোক না কেন , সীমিত ওভারের ক্রিকেটে আরও ভালো করে বললে আইসিসি টুর্নামেন্টে ইঙ্গভূমে নীল জার্সির কলার তোলা ঔদ্ধত্য গত কয়েকবছর যাবৎ লক্ষ্য করছি | ২০১৩ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে আয়োজক ইংল্যান্ডকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন এবং দু’বছর আগে আরও এক চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে রানার্স হওয়া যার জলজ্যান্ত সাক্ষ্য বহন করছে | ভুলে গেলে চলবে না এদেশই কিন্তু দিয়েছে শতকোটি মানুষকে প্রথম বিশ্বজয়ের স্বাদ | স্বীকার করতে দ্বিধা নেই ৮৩ বিশ্বকাপ ফাইনালের সেই জয় ভারতীয় ক্রিকেটের খোলনলচেই আমূল পরিবর্তিত করে দিয়েছিল | এর আগের দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে মাত্র একটা জয় নিয়ে দেশে ফেরা একটা দল যে এভাবে দু’বারের বিশ্বজয়ী ক্যারিবীয় দৈত্যদের সংহার করে বিশ্ব ক্রিকেটের লালকেল্লায় সদর্পে তেরঙ্গা ঝান্ডা গেঁড়ে দেবে এমন অলীক প্রত্যাশা সেদিন কেউই করেননি | কিন্তু তিরাশির বিশ্বকাপ জয় বিশ্ব ক্রিকেটকে বাধ্য করেছে ভারতকে সমীহর চোখে দেখতে | বলা ভালো ভারতীয় ক্রিকেটের সেনসেক্স এরপর থেকেই উর্দ্ধমুখী | ২০০৩ দক্ষিন আফ্রিকা বিশ্বকাপে ফাইনালে পৌছেও সৌরভের টিম ইন্ডিয়ার কাপ জয়ের স্বপ্ন অস্তমিত হতে দেখা আজও সাধারন ভারত সমর্থকদের হৃদয়ে টাটকা ক্ষতচিহ্ন | এখনও মনে আছে সেই বিশ্বকাপ নিয়ে কী অসম্ভব রকমের ক্রেজ ছিল কলকাতা সহ সারা রাজ্যে | জাতীয় পতাকা আর সচিন-সৌরভদের ব্যানার ফেস্টুনে ছেয়ে গিয়েছিল প্রতিটি পাড়া-মহল্লা | সঙ্গে চলছিল সৌরভদের নামে পুজো , হোম-যজ্ঞ | বেহালার বীরেন রায় রোডের ছেলেটার হাতে বিশ্বকাপ দেখার লালিত স্বপ্নের ওপর দিয়ে অজিরা সেদিন যেভাবে বুলডোজার চালিয়ে দিয়ে গিয়েছিল ষোলো বছর কেটে যাবার পরও তা আজও মনে করতে পারি | তবে আরও একটা বিশ্বকাপের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে পাঠকদের সামনে এমন অলক্ষুনে কথা আর বলব না |

টিম কোহলির এবারের কাপভাগ্য আরও বেশি করে উজ্জ্বল দেখাচ্ছে এ জন্যই যে অতীতের মতো এই দলটা কেবলমাত্র ব্যাটিংকে শিখন্ডি করে বিশ্বযুদ্ধে নামছে না | কলকাতার একটি নামী শাড়ি বিপণনীর বিজ্ঞাপনের ‘এই দোকানে সিল্ক ভালো ঐ দোকানে তাঁত’ এর মতো বরাবরই শুনে এসেছি ভারতের ব্যাটিং ভালো , পাকিস্তানের বোলিং | এসব এখন অতীত | ব্যাটে বলে সামঞ্জস্য পূর্ণ একটা দল নিয়ে সম্ভবত এই প্রথম কোনো বিশ্বকাপে নামছে ভারত | সঙ্গে হার্দিক পান্ডিয়া , কেদার যাদব বা বিজয় শঙ্করের মতো অলরাউন্ডার ভারতীয় দলের সিকিওরটি ডিপোজিটের মতো সবসময় ভরসা দিচ্ছে | গেরস্থের দুঃসময়ের জন্য এরা কোষাগারে গচ্ছিত আছে | এর মধ্যে শেষোক্ত দুজনের চোট নিয়ে তৈরি হওয়া অপ্রত্যাশিত খচখচানি ভারত সমর্থকদের কপালে সামান্য হলেও চিন্তার ভাঁজ ফেলবে সন্দেহ নেই | ইংল্যান্ড যাত্রার ঠিক আগে কেদারকে ফিট ঘোষনা করা হলেও গতকাল প্রস্তুতি ম্যাচের সময় কাঁধে আইস প্যাক নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে তাঁকে | অন্যদিকে দিন দুয়েক আগে প্র্যাকটিস চলাকালীন চোট পেয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন বিজয় শঙ্করও | নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি ম্যাচে হার নিয়ে তেমন একটা চিন্তার কারন দেখছেন না বিশেষজ্ঞ মহল | গতকালের স্যাঁতস্যাঁতে পিচে বল সুইং করলেও যত দিন যাবে ইংল্যান্ডে গরম বাড়ার সঙ্গে পিচও শুকনো খটখটে হয়ে আসবে বলেই মনে করা হচ্ছে | টিপিক্যাল ইংলিশ উইকেট কিন্তু এখন আর দেখা যায় না | বিগত কয়েক বছর যাবৎ অনেকটা উপমহাদেশের মতোই পিচ হচ্ছে বিলেতে | সদ্য সমাপ্ত ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজ সিরিজেই মুড়ি মুড়কির মতো রান উঠতে দেখা গেছে | তা ছাড়া ইতিহাস ঘেঁটে দেখা গেল প্রস্তুতি ম্যাচে খারাপ ফল হলেই নাকি বিশ্বকাপে ভালো করে ভারত | কাকতালীয় হলেও নিমর্ম বাস্তব | ৮৩ ও ২০১১ বিশ্বকাপের দুটো প্রস্তুতি ম্যাচে একটা জয় , একটা হার | ২০০৩ বিশ্বকাপের ওয়ার্ম আপ ম্যাচে দুটোতেই হেরেছিল টিম ইন্ডিয়া | এমনকি নাটাল একাদশের মতো নামগোত্রহীন টিমের কাছেও হেরেছিলেন সৌরভরা | সেই তিন বিশ্বকাপে ভারতের ফলাফল তো সবারই জানা | অন্যদিকে ২০০৭ বিশ্বকাপের দুটো ওয়ার্ম আপ ম্যাচই জেতে দ্রাবিড় বাহিনী | ফলাফল বাংলাদেশ , শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে গ্রুপ পর্বের বাধাও সেবার টপকাতে পারেনি ভারত | মানছি এসব নিছকই মন ভোলানো পরিসংখ্যান , কিন্তু এবারের কাপ যুদ্ধে পিচে সুইং থাকলেও এই ভারতীয় দলের কাছে তা জুজু হয়ে দেখা দেবে বলে মনে হয় না | ভুবনেশ্বর কুমারের মতো দু’দিকেই সুইং করাতে সক্ষম কেউ দলে থাকলে ভারত অধিনায়কের রাতের ঘুম নষ্টের কোনো কারন দেখছি না |

বিশ্বকাপে ভারতের এক্স-ফ্যাক্টর :

শিখর ধাওয়ান

আইসিসি টুর্নামেন্ট এলেই জ্বলে ওঠা এই ওপেনারের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে ভারতের | রোহিতের সঙ্গে একটা ভালো শুরু দিতে পারলে মিডল অর্ডারের কাজটা অনেকটাই সহজ হয়ে যাবে কোহলিদের |

বিরাট কোহলি

তর্কাতীত ভাবে এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা ব্যাটসম্যান | বড় রান তোলার ক্ষেত্রে এবং রান তাড়া করার ক্ষেত্রে তাঁর দিকেই তাকিয়ে থাকবে টিম | বিশেষ করে চার নম্বর পজিশন নিয়ে যখন টিম ভুলভুলাইয়ার দিকভ্রান্ত পথিক তখন বিরাটের ব্যাটই মিডল অর্ডারে ভারতের প্রধান স্তম্ভ | দলের অধিনায়ক হিসেবে বাড়তি দায়িত্ব তাঁর কাঁধে | বিরাটীয় আগ্রাসনও প্রতিপক্ষকে মানসিক দিক থেকে ঝলসে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট | অধিনায়কত্বের বোঝা কাঁধে নিয়ে প্রথমবার বিশ্বমঞ্চে কতটা সফল হন তিনি সেটাই দেখার |

মহেন্দ্র সিং ধোনি

“যাও গো এবার যাবার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও” | শেষ বিশ্বকাপ রাঙিয়ে দিয়ে যেতে চেষ্টার কোনো কসুর করবেন না ধোনি তা বলাই বাহুল্য | হিমশীতল মস্তিষ্কে ম্যাচ বের করার ক্ষমতা আজও অটুট | প্রয়োজনে অধিনায়ককে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতে পারেন | উইকেটের পিছনেও তাঁর বিশ্বস্ত দুটো হাত ভারতকে ভরসা দেবে | গত অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে দারুন ফর্মে তাই ধোনিকে নিয়ে আশা করাই যায় |

কুল-চা জুটি

কুলদীপ-চাহালের স্পিন জুটি বোলিংয়ে টিম ইন্ডিয়ার বড় ভরসা | সৌরভের মত প্রাক্তনরা মনে করছেন স্পিন বোলিংয়ের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে এই বিশ্বকাপে | গত কয়েক বছর ধরে কুলদীপ চাহালদের ধারাবাহিকতা ওয়ান ডে তে ভারতের সাফল্যের একটা বড় কারন |

জসপ্রীত বুমরা

বর্তমান বিশ্বের সেরা ডেথ বোলার | নিঁখুত ইয়র্কারেও প্রতিপক্ষের স্টাম্প ছিটকে দিতে পারেন | ডেথ ওভারে হরির লুটের মতো রান বিলিয়ে অতীতে বহু ম্যাচ হেরেছে ভারত | এবার সেই ডেথ বোলিংই কোহলি ব্রিগেডের অন্যতম শক্তি |

ভুবি-শামি 

একজন সুইংয়ের সুলতান অন্যজন গতির স্টিম রোলার | স্যাঁতস্যাঁতে উইকেটে ভুবনেশ্বরের বোলিং যেমন ভারতের তুরুপের তাস হতে পারে তেমনি গতিশীল উইকেটে শামির গতির আগুনে ভস্মীভূত হতে পারে বিপক্ষ | অস্ট্রেলিয়া সফরেই তার ঝলক দেখিয়েছেন বাংলার নবাব | ভুবি-শামি দু’জনই তাই বিরাটদের বিশ্বকাপ অভিযানে সেরা অস্ত্র |

অতীতের কাপ ইতিহাসে ভারত :

১৯৭৫ ও ১৯৭৯ : গ্রুপ পর্ব , ১৯৮৩ : চ্যাম্পিয়ন , ১৯৮৭ : সেমিফাইনাল , ১৯৯২ : গ্রুপ পর্ব , ১৯৯৬ : সেমিফাইনাল , ১৯৯৯ : সুপার সিক্স , ২০০৩ : রানার্স আপ , ২০০৭ : গ্রুপ পর্ব , ২০১১ : চ্যাম্পিয়ন , ২০১৫ : সেমিফাইনাল

ভারতের বিশ্বকাপ স্কোয়াড :

বিরাট কোহলি (অধিনায়ক) , রোহিত শর্মা (সহ অধিনায়ক) , শিখর ধাওয়ান , লোকেশ রাহুল , মহেন্দ্র সিং ধোনি , হার্দিক পান্ডিয়া , কেদার যাদব , বিজয় শঙ্কর , দীনেশ কার্তিক , রবীন্দ্র জাডেজা , ভুবনেশ্বর কুমার , কুলদীপ যাদব , যুজবেন্দ্র চাহাল , মহম্মদ শামি , জসপ্রীত বুমরা

লিখেছেন : অনিরুদ্ধ মন্ডল

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here