বাগানে বেনজির গৃহযুদ্ধ , দুই মেরুতে কর্মকর্তা ও সমর্থক

0
333

অনিরুদ্ধ মন্ডল: অনেক রকমের বিপ্লব-বিদ্রোহ দেখেছে কলকাতা ময়দান কিন্তু এ হেন অভিনব বিদ্রোহের নজির শেষ কবে দেখা গ্যাছে তা শত চেষ্টা করেও মনে করতে পারলাম না | এমনিতে খেলাধুলোর ইতিহাসে অত্যাশ্চর্য বিদ্রোহের দৃষ্টান্তের কোনো অভাব নেই শহর কলকাতায় | অতীতে ইডেন টেস্ট থেকে মুস্তাক আলিকে অন্যায় ভাবে বাদ দেওয়ার কারনে যেমন বিক্ষোভ দেখিয়েছে এই শহর | মাঠের বাইরে পোস্টার পড়েছে “নো মুস্তাক নো টেস্ট “ | জনতার রোষে শেষমেশ প্রায় বাধ্য হয়ে মুস্তাকের দলে অন্তর্ভুক্তি ঘটিয়েছে ভারতীয় বোর্ড | তেমনি বছর চোদ্দো আগে গুরু গ্রেগের ষড়যন্ত্রে সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের দল থেকে বাদ পড়ার প্রতিবাদে চির জাতীয়তাবাদী ইডেন জনতা প্রাণখোলা সমর্থনে ভরিয়ে দিয়েছে গ্রেম স্মিথের দক্ষিন আফ্রিকাকে | স্মিথ , কালিসদের এক একটা বাউন্ডারি , রাহুল দ্রাবিড়ের ভারতের এক একটা উইকেট পতনে সেদিনের ইডেন গ্যালারির উল্লাসে ফেটে পড়া দেখতে দেখতে তাজ্জব বনে গিয়েছিল প্রোটিয়া বাহিনী | কিংবা ৯৯ এ টেস্ট চ্যাম্পিয়নশীপে শোয়েব আখতারের সচিনকে করা সেই অন্যায় রান আউটের তীব্র প্রতিবাদে গ্যালারি উত্তাল হয়ে ওঠা | যার জেরে গোটা ইডেন খালি করে গ্যালারি শূন্য মাঠে বাকি ম্যাচ শেষ করতে হয়েছিল সিএবি-কে | অথবা ৯৬ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে শ্রীলঙ্কার কাছে আজহারের ভারতের অসহায় আত্মসমর্পনে ইডেন গ্যালারিতে বিক্ষোভের দাবানল | বিনোদ কাম্বলির কাঁদতে কাঁদতে মাঠ ছাড়ার সেই চিরকালীন শোকগাথা , এগুলোও তো শহর কলকাতার বিদ্রোহের এক একটা রূপ |

তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে গতকাল যেভাবে মোহনবাগানের প্রায় একশোটা ফ্যান ক্লাব একজোট হয়ে নজিরবিহীন ভাবে জানিয়ে দিলেন বাগানের বাকি ম্যাচগুলিতে তাঁরা আর মাঠে উপস্থিত থাকবেন না তা একবারেই অভূতপূর্ব | যে কর্মকর্তাদের নামে কিছুদিন আগে অবধি গোষ্ঠ পাল সরনীতে জয়ধ্বনি শোনা যেত মাস কয়েক এর আকস্মিক পট পরিবর্তনে গঙ্গাপারের ক্লাবে যে এরকম গৃহযুদ্ধ ঘটে গিয়ে কর্মকর্তা ও সমর্থকের বিপরীত দুই মেরুতে দাঁড় করিয়ে দেবে এমনটা কী কেউ কস্মিনকালে আন্দাজ করতে পেরেছিল?
এমনিতে ইনভেস্টর আনা নিয়ে কর্তাদের বিলম্বতে ক্ষোভের আগুন ধিক ধিক করে জ্বলছিল বাগান সমর্থকদের হৃদয়ে | তবে গত রবিবার ডার্বিতে কর্তাদের নির্দেশে পুলিশ বাগান সমর্থকের মাঠে টিফো বা ব্যানার নিয়ে ঢুকতে না দেওয়ায় তা এবার দাবানল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে | যদিও ক্লাবের তরফ থেকে বলা হয়েছে কোনো ব্যক্তি বিশেষ বা কোনো বিশেষ ফ্যান ক্লাবকে আটকানো তাঁদের লক্ষ্য ছিল না | ডার্বিতে কোনোরকমের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতেই ক্লাবের তরফ থেকে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কেউ যেন কোনো রকম ব্যানার বা টিফো নিয়ে মাঠে ঢুকতে না পারে | গত ডার্বিতেই ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের এক অশ্লীল টিফোকে ঘিরে বিতর্ক বেঁধেছিল ম্যাচের পর | যার জেরেই বাগানের তরফ থেকে এবার এ হেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় | যদিও কেউ কেউ বলছেন তাহলে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকরা মাঠে ব্যানার নিয়ে ঢুকলেন কী করে? কারোর কারোর মতে গত কয়েকটি ম্যাচে বাগানের একটি ফ্যান ফোরামের উদ্যোগে ইনভেস্টর না আনা নিয়ে বাগান কর্তাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটা ব্যানার মাঠে দেখা গিয়েছিল | যাতে মোহনবাগান কর্মকর্তাদের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছিল | তাঁদের মতে সেই প্রতিবাদের কন্ঠ রোধ করতেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কর্তারা |
যদিও দিন কয়েক আগেই ক্লাবের কার্যনির্বাহি কমিটির বৈঠকের পর সচিব টুটু বোস ও অর্থসচিব দেবাশিস দত্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন তাঁদের ইনভেস্টর চূড়ান্ত | ফেডারেশন আইএসএলের বিডের দিনক্ষন জানালেই তাঁরা ইনভেস্টরের নাম ঘোষনা করে দেবেন | সেই বৈঠকে মোহনবাগান ক্লাবকে সোসাইটি রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্টের আওতায় নথিভুক্তও করা হয় | যার ফলে নাম , লোগো ও জার্সির রং এর সরকারিভাবে স্বত্ব পায় মোহনবাগান ক্লাব | এছাড়াও ক্লাবের চার শেয়ার হোল্ডার স্বপনসাধন বোস , সৃঞ্জয় বোস , দেবাশিস দত্ত ও অঞ্জন মিত্র তাঁদের হাতে থাকে সব শেয়ার তুলে দেন মোহনবাগান বাগান ফুটবল ক্লাব ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির নামে | যার জেরে এখন থেকে মোহনবাগান ক্লাবের মালিক হন ক্লাবের সকল সদস্য | অর্থসচিব দেবাশিস দত্তের মতে এতোদিন তা না হওয়ায় তাঁদের ইনভেস্টর আনতে সমস্যা হচ্ছিল | ব্যক্তি মালিকানায় থাকা ক্লাবে লগ্নি করতে কেউই আগ্রহী হচ্ছিল না | তবে এখন আর কোনো বাধা রইল না | তাঁর মতে যাদেরই ইনভেস্টর হিসেবে আনা হোক না কেন তাঁদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি করতে চায় বাগান | দেবাশিস বাবুর মতে যে কোম্পানিকে আনা হবে তাঁকে বাংলার ঘরে ঘরে লোকে চেনে | যদিও সমর্থকরা বলছেন এমন প্রতিশ্রুতি তাঁরা অনেক শুনেছেন তাই না আঁচালে বিশ্বাস নেই | সেকারনে যতদিন না তা হচ্ছে তাঁদের স্লোগান একটাই “হৃদয়ে থাক মোহনবাগান ,গ্যালারি থাক শূন্য “।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here