বদলে যাওয়া সুনীলদের আজ ‘মাধ্যমিক’ পরীক্ষা

0
132

কলকাতা প্রতিনিধিঃ শিরোনাম পড়ে পাঠকদের বিস্মিত লাগলেও এই প্রতিবেদকের কিছু করার নেই। সুনীলদের এশীয় মহাযুদ্ধে নামার বারো ঘন্টা আগে এরথেকে যর্থাথ কিছু আর মাথায় আসছে না। “উল্টে দ্যাখো পাল্টে গেছি” পূনর্জন্ম হওয়া ভারতীয় ফুটবল দলের এখন এটাই অদৃশ্য টেমপ্লেট।

কয়েক বছর আগে ফিফা সভাপতি থাকাকালীন শেপ ব্লাটার একবার বলেছিলেন ফুটবলে ভারত ‘ঘুমন্ত দৈত্য’। সেই ঘুমন্ত দৈত্য-র ঘুম এখনও যদিও বা পুরোপুরি না ভাঙে , তবুও গভীর নিদ্রা ভেঙে ঘোর লাগা তন্দ্রায় এখন তার অবস্থান এটুকু বলাই যাই। নাহলে কেনই বা ২০১৫ তে ১৭৫ অবস্থানে থাকা একটা দেশ সাফল্যের হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে তিন বছরের মধ্যে ৯৭ এ উঠে আসবে। কোন মন্ত্রবলে সম্ভব এমন আকস্মিক ভোলবদল? এবং ভারতীয় ফুটবলের এই আমূল বদলে যাওয়া ফুটবল পাগল জনতার চোখে এই তিন বছরে যতটা না দৃষ্টিগোচর হয়েছে তার থেকে দ্বিগুন বেশি চোখে পড়বে সুনীলদের আগামী তিনটে ম্যাচে। অনুবীক্ষন যন্ত্রের তলায় ফেলে ময়নাতদন্ত হবে সুনীল-জেজেদের | বিগত তিন বছরে তুমি যতই ১৩ ম্যাচে অপরাজিত থাকো বা প্রবল পরাক্রমী চিনকে তাঁদের দেশে রুখে দাও না কেন আগামী তিন ম্যাচ যে সুনীলদের কাছে অ্যাসিড টেস্ট তা তাঁরা নিজেরাও বিলক্ষন জানেন।

পাল্টে যাওয়া এই ভারতের কাঁটাছেড়া করলে এক ঝলকে যা উঠে আসছে তা হল এই দলটার জেতার ক্ষিদে , সাফল্যের উদগ্র বাসনা এবং লৌহকঠিন কলজে। বিগত তিন বছরে ভারতীয় ফুটবলের পরিকাঠামো যে একেবারে আমূল বদলে গিয়ে রাতারাতি সন্দেশ-প্রীতম-গুরপ্রীতদের স্কিলের খোলনলচে বদলে দিয়েছে এমনটা নয়। উপরোক্ত এই তিন মন্ত্রই তাঁদের পূর্বসূরীদের থেকে সুনীলদের তফাত করে দিচ্ছে। এমনিতে সুনীল এই মুহুর্তে ভারতীয় ফুটবলের শালগ্রাম শিলা। সতীর্থ প্রত্যেক ফুটবলার এবং উঠতি তরুনদের চোখেও চলমান অনুপ্রেরনা। সেই সুনীলই বলছিলেন আমাদের হারানো অত সহজ হবে না , এশিয়ান কাপের যেকোনো দলকে টেক্কা দিতে আমরা তৈরি। এহেন লৌহ মানসিকতা ভারতীয় ফুটবলে শেষ কবে দেখেছি মনে করতে পারলাম না।

মুম্বই ক্রিকেট মহলে প্রচলিত একটা শব্দবন্ধ আছে “খারুশ ক্রিকেট”। অর্থাৎ দয়া মায়া ত্যাগপূর্বক কঠিন নির্জলা মনে ক্রিকেট সাধনা। সুনীলদের দেখে মনে হচ্ছে মুম্বইয়ের সেই ক্রিকেট কালচার তাঁরা ফুটবলেও বহন করছেন নাকি? এমনিতে রবিবাসরীয় সন্ধ্যায় সুনীলদের যারা প্রতিপক্ষ সেই থাইল্যান্ড রাঙ্কিংয়ে সুনীলদের থেকে বেশ খানিকটা পিছিয়ে। সাম্প্রতিক পারফর্মেন্সও তেমন পাতে দেওয়ার মতো নয়। সদ্য সদ্য এএফএফ টুর্নামেন্টের তাজ খুইয়ে বারো বছর পর এশিয়ান কাপে লড়তে এসেছে। সেই থাইল্যান্ডের সার্বিয়ান কোচ মিলোভান রাজেভেচ অবশ্য গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে এসে সাফাই দিয়ে গেলেন ক্লাবের খেলা থাকায় এএফএফ টুর্নামেন্টে তাঁদের জাতীয় দলের অনেক ফুটবলারই নাকি খেলেননি তাই এই ভরাডুবি। সেই দলের সঙ্গে এই দলকে মেলানো ঠিক হবে না।

ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখলাম ভারত শেষবার থাইল্যান্ডকে খেলেছে ২০১১ সালে। থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারতের শেষ জয় তারও আগে ১৯৮৬ সালে মারডেকা কাপে। তবে ম্যাচের বারো ঘন্টা আগে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে প্রতিপক্ষ থাইল্যান্ড নয় , আজ আল নাহইয়ান স্টেডিয়ামে সুনীলদের একমাত্র প্রতিপক্ষ যদি কেউ থেকে থাকে তাহল আবুধাবির আর্দ্রতা। তাপমাত্রা সর্বনিম্ন ১৬ সর্বোচ্চ ২৬ দেখালে কী হবে ৯৩% আর্দ্রতায় ফুটবলারদের নাজেহাল অবস্থা।

গতকাল আরব আমিরশাহী-বাহরিন উদ্বোধনী ম্যাচেই দেখছিলাম ঘেমে নেয়ে ফুটবলাররা কাহিল | তবুও সাধারন ফুটবল প্রেমী থেকে প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলার এই দলটাকে নিয়ে চরম আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। জাতীয় ফুটবল দলকে নিয়ে এমন আবেগের গনবিস্ফোরন ভারতে শেষ কবে দেখা গিয়েছে? কলকাতা , মুম্বই , থানের মতো আরও অনেক শহরে ভারতের ম্যাচ দেখানোর জন্য লাইভ স্ক্রিনিংয়ের বন্দোবস্ত করা হয়েছে , সঙ্গে ম্যাচ দেখতে দেখতেই খানাপিনার আয়োজন।

বাইচুং-আইএম বিজয়নের মতো কেউ কেউ তো বলেই দিচ্ছেন তাঁরা সুনীলদের পরের রাউন্ডে দেখছেন। মনে হচ্ছে প্রাক্তন ফুটবলারের প্রোটোকল ভূলে তাঁরাও ভারতীয় ফুটবল অনুরাগীর দেশপ্রেমী অদৃশ্য সানগ্লাস চোখে বসিয়ে নিয়েছেন। অবশ্য সুনীলদের নিয়ে আশাবাদের কারনও আছে যথেষ্ট। শেষ যেবার ভারত এশিয়ান কাপে নেমেছিল সেবারের তুলনায় এবারের গ্রুপ তুলনামূলক সহজ। আমিরশাহিকে না পারা গেলেও থাইল্যান্ড , বাহরিনকে হারাতে সমস্যা হওয়ার কথা নয় জেজেদের। এবারের দলটাও অভিজ্ঞতা ও তারুন্যের মিশেলে যথেষ্ট ব্যালান্সড্। এবং সবার ওপরে  ভরসার নাম নেতা সুনীল। ভারতীয় ফুটবলের পরশপাথর , গত কয়েকবছর ধরে যা স্পর্শ করছেন তাই সোনা। কোচ স্টিফেন কনস্ট্যানটাইনকেও যথেষ্ট আশাবাদী শোনাল।

এশিয়ান কাপের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট , এবার সেটা মাঠে প্রয়োগের পালা। শুনে মনে হল প্রথম কুড়ি মিনিট প্রতিপক্ষকে মেপে নিয়ে আক্রমনের স্টিম রোলার চালানোই তাঁর রণনীতি। ডিফেন্ডার সন্দেশ ঝিঙ্গানও বলছিলেন আট বছর আগে শেষ বার এশিয়ান কাপে ভালো খেলেও বাহরিনের কাছে ভারতের হার দেখতে দেখতে টিভির সামনে কেঁদে ফেলেছিলেন কিশোর সন্দেশ। সেই কান্নাকে হাসিতে রূপান্তরিত করার গুরুদায়িত্ব এবার তাঁর কাঁধেও। দূর্গের শেষ প্রহরী গুরপ্রীতের কথাতেও উঠে এল আট বছর আগের এশিয়ান কাপে ভারতের দূর্গ রক্ষা করা সুব্রত পালের কথা। বলছিলেন সুব্রত ভাই তাঁর অনুপ্রেরনা। অবশ্য সেবারের সুব্রতর মতো অতো সেভ সে করতে চায়না। পরিষ্কার ইঙ্গিত শুধু দূর্গ রক্ষা নয় এই নয়া ভারত বিপক্ষ দূর্গেও হানা দিয়ে তছনছ করার স্বপ্ন দেখে। বলছিলাম না এশিয়ান কাপের মাহাত্ম্য এই দলের প্রত্যেকেই খুব ভালো করে জানে। এশিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ের টুর্নামেন্টে সাফল্য পেলে তাঁদের জীবনের গতিপথ যে ঘুরে যাবে সে সম্পর্কে প্রত্যেকেই ওয়াকিবহাল। এতোদিন স্কুলের পরীক্ষায় তুমি সসম্মানে উত্তীর্ন হয়েছো। এবার মাধ্যমিকে লেটার পেলে তবে না তুমি কুলীন হলে!

আজ টিভিতে
ভারত বনাম থাইল্যান্ড
সন্ধ্যা ৭:৩০টায় (বাংলাদেশ সময়)
সরাসরি স্টার স্পোর্টস ২,৩ ও জলসা মুভিজে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here