ফুটবলের নয়ন,বিচরণের নয়ন…নিজেরা ভুলে যায়,তুলনা খুঁজে না পায়…(১ম পর্ব)

0
285
বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সর্বপ্রথম খেলোয়াড়দের হাত ধরে ফুটবলের যাত্রা শুরু....

এলিস হকঃ প্রথমেই শুরু করা হোক-সেকালের ঢাকা ফুটবলচিত্রে সত্তর হতে আশির দশক পর্যন্ত। গোলকিপার সান্টু হতে গোলকিপার মঈন অবধি-এই দশ বছরের রোজনামচায় লিখতে হচ্ছে। প্রথম দফায় স্ট্রাইকার এনায়েত-কাজী সালাহউদ্দিন দিয়ে ঐ দ্বিতীয় দফায় স্ট্রাইকার হাসান-বাবলু অবধি লেখাটুকু লিখে শেষ করতে চাই না।

মজার ব্যাপার হচ্ছে-একজন খেলোয়াড় দুটো ইভেন্টের খেলায় পারদর্শি ছিলেন। তিনি কে? নিশ্চয়ই করে লিখতে দ্বিধা নেই-তিনি সান্টু। পুরো নাম শহীদুর রহমান চৌধুরী। ফুটবলের আরেক বিখ্যাত গোলরক্ষক। খেলেছেন সেই রাজশাহীর সানরাইজ স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে তার প্রথম ফুটবল নয়, একেবারেই ক্রিকেট প্রতিযোগিতায়। খেলার নাম আন্তঃস্কুল ক্রীড়া।

একটা মাসুম বাচ্চা। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। সেকি রীতিমতো এ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী শোনাবে তার জীবনকে সূত্র ধরে। চাট্টিখানি কম না। তিনি শখের বশে খেলতেন। অন্যকিছু নয়। খেলাতেই বিনোদন। সেই সময়টা ছিল ১৯৬৩ সাল।

১৯৮০ সালে এশিয়ান কাপ ফুটবল…ইরানের বিপক্ষে বাংলাদেশের গোলকিপার সান্টু…কালো জার্সি পরা….

১.০ ।। কি মানের পারফরমার? কেমন ছিলেন তিনি?

নিশ্চয়ই তিনি দীর্ঘদেহী ছিলেন। লম্বাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা এই যে-বল উড়ে আসা মাত্র ছোট্ট করে লাফিয়ে উঠে চমৎকার ভঙ্গিতে গ্রীপ ধরা। দেখার মতোই ব্যাপার-স্যাপার ছিল সেকালে। বুদ্ধিমান গোলরক্ষক। বিপদসীমানায় বল ঢোকা মাত্রই আক্রমণভাগের যেকোনো খেলোয়াড়ের উপর পুরো দেহ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়াই ছিল-রীতিমতো দুঃসাহসিক ব্যাপার। ভাবাই যায় না!

এনালগযুগে সায়েনটিস্ট গোলকিপার। সেকালের অধ্যায়কে বলা যায় অভাবনীয়। অথচ নির্ভেজাল ফুটবল তারকা। তার চৌকস আর দক্ষতাকে পরিপূর্ণ এক অসাধারণ গোলরক্ষক সান্টু। যে সান্টুকে দিয়ে মাঠে নামানো হলে যেকোনো ক্লাবের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরা খুব দুশ্চিন্তায় ভুগতেন। ‘কখন আমার উপর তাঁর দেহভাগের দুই অংশে ঝাঁপিয়ে পড়বেন’-এই শঙ্কায় জাগতো সব সময়। বিচলিত হয়ে পড়তেন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা।

সত্যি বলতে গেলে গোলকিপার সান্টুর দিকে তাক করে যে কোনো বলে শট করলে তিনি হয় বল পাঞ্চ করে উড়িয়ে দেবেন। নয়তো বলকে নির্ভুলভাবে গ্রীপ ধরিয়ে নেবেন। ডানে-বামে ছুটে আসা বল দেখামাত্রই বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে নিয়ে যাবেন…এমন উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল সান্টুর কৃতিত্বে।

১.১ ।। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ফুটবলের বছর ১৯৭৩…

একটা লাইমলাইটে শুরু হোক-গোলকিপার সান্টুর জীবনে তাঁর সমসাময়িককালের ফুটবল খেলোয়াড়রা ছিলেন গোলকিপার মোতালেব, জাকারিয়া পিন্টু, নান্নু, নাজির, আব্দুল হাকিম, দিলীপ, আশরাফ, ফারুক, শরিফ, কায়কোবাদ, এনায়েতুর রহমান, কাজী সালাহউদ্দিন, প্রতাপ হাজরা, ফিরোজ, নওশের ও সুনীল।

গোলকিপার সান্টুর সমসাময়িককালের তথা সত্তর দশকের সতীর্থ ফুুটবল খেলোয়াড়…

দেশের প্রখ্যাত ক্রীড়া সাংবাদিক নজমুল আমিন কিরনের তথ্যসূত্র মতে- ‘যাদের হাত ধরেই লাল-সবুজ পতাকার বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের ফুটবল মাঠের লড়াইয়ের পথ চলাটা শুরু হয়েছিলো…বলছিলাম আজ ৪৫ (এখন ৪৯) বছর আগে ১৯৭৩ সালে মালয়েশিয়ার মারদেকা টুর্নামেন্টে খেলা প্রথম জাতীয় ফুটবল দলের তারকা ফুটবলারদের কথা…সেবার জাতীয় ফুটবল দলে খেলার সুযোগ লাভ করেছিলেন ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ৪ জন, আবাহনী ক্রীড়া চক্রের ২ জন, অফিস দল বিআইডিসির ৩ জন, অফিস দল ওয়াপদার ৪ জন, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ২ জন, ইস্ট এন্ড ও রহমতগঞ্জের ১ জন করে খেলোয়াড়…কোচ সাহেব আলীর তত্ত্বাবধানে গড়া ১৭ সদস্যের জাতীয় দলে স্থান পাওয়া খেলোয়াড়রা হলেন মোহামেডানের স্টপার ব্যাক জাকারিয়া পিন্টু, মিডফিল্ডার মোহাম্মদ কায়কোবাদ, রাইট উইঙ্গার প্রতাপ শংকর হাজরা, ডিফেন্ডার মনোয়ার হোসেন নান্নু, আবাহনীর স্ট্রাইকার কাজী সালাউদ্দিন তুর্য, স্টপার ব্যাক শেখ আশরাফ আলী, বিআইডিসির লেফট ব্যাক আবদুল হাকিম, স্টপার নাজির আহমেদ চৌধুরী, স্ট্রাইকার এনায়েতুর রহমান এনায়েত, ওয়াপদার স্ট্রাইকার নওশেরুজ্জামান নওশের, স্ট্রাইকার সুনিল কৃষ্ণ দে, স্টপার ব্যাক দিলীপ কুমার বড়ুয়া, মিডফিল্ডার শরিফুজ্জামান, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের গোলকিপার শহিদুর রহমান সান্টু, রাইট ব্যাক ফারুকুজ্জমান ফারুক, ইস্ট এন্ডের লেফট আউট ফিরোজ, রহমতগঞ্জের গোলকিপার মোতালেব…প্রথম বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মোহামেডানের অভিজ্ঞ ফুটবলার দক্ষ স্টপার ব্যাক জাকারিয়া পিন্টু…প্রথম জাতীয় দলটার মোট ৮ জন ফুটবলার ছিলেন স্বাধীন ফুটবল দলের খেলোয়াড়…এরা হচ্ছেন জাকারিয়া পিন্টু-আশরাফ-হাকিম-এনায়েত-সালাউদ্দিন-প্রতাপ-কায়কোবাদ ও নওশের….প্রথম জাতীয় ফুটবল দলের ফুটবলারদের মধ্যে আজ আর আমাদের মাঝে নেই ৫ জন…এরা হলেন মরহুম মোতালেব-ফারুক-দিলীপ-নান্নু’

১.২ ।। বিতর্কের সৃষ্টি খেলোয়াড় নির্বাচন নিয়ে…

সেকালের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কোনো তথ্য আজকের জমানায় আর পাওয়া যায় না। দুষ্প্রাপ্যে পরিণত কিনা জানা নেই। তবে তথ্য ঘাটতে গিয়ে জানা গেলো-দলের খেলোয়াড় নিয়ে হুট হাট বিতর্ক হয়েছিল…তখনকার পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম। শক্তিশালী মিডিয়া ছিল না বললেই চলে। ইথারের খবর ওথারের খবর পৌঁছাতে অনেক সময় লাগতো। যাইহোক-সেই ঘটনা কি ছিল? প্রাপ্ত তথ্যসূতে জানা যায়-

‘১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় দলগঠনের কাজটায় বড় রকম বিতর্কের জন্ম দিয়েছিলো নির্বাচকরা। প্রথম দফায় জাতীয় দলে ইস্ট এন্ডের মাঝমাঠের খেলোয়াড় আলমগীরকে সুযোগ দিয়ে তালিকা ঘোষণা দিয়েছিলেন নির্বাচকরা। যে তালিকা পত্রপত্রিকায় ছাপাও হয়ে যায়। অথচ কোন কারণ ছাড়াই হুট করে আলমগীরকে বাদ দিয়ে ওয়াপদার মিডফিল্ডার শরিফকে দলে টেনে নেন নির্বাচকরা!! মজার ব্যাপার হলো শরিফকে প্রথম অবস্থায় স্ট্যান্ড বাই তালিকাতেও রাখেননি নির্বাচকরা। জাতীয় দলের মূল স্কোয়াডের বাইরে স্ট্যান্ড বাই তালিকায় অন্তর্ভূক্ত ছিলেন ওয়াপদার গোলকিপার ফজলুল করিম। আবাহনীর সাইড ব্যাক জাহাঙ্গীর শাহ বাদশা-বিআইডিসির স্টপার জহুরুল-আবাহনীর উইঙ্গার অমলেশ ও মোহামডানের উইঙ্গার ওয়াজেদ গাজী। সে বছর দুর্দান্ত ফর্মে থাকা গাজীকে দলে স্থান না দিয়ে অফ ফর্মে থাকা নওশেরের মূল দলে সুযোগ লাভটা নিয়েও বেশ সমালোচনা করে লেখালেখিও হয়েছিল দৈনিক পত্রিকায়। তেমনি সমালোচিত হয় ব্যাক বাদশার সুযোগ না পাওয়াটা নিয়েও। এখানে উল্লেখ্য যে ফুটবলার এই বাদশাই হলেন এক সময়ের জাতীয় ক্রিকেট দলের খ্যাতিমান চৌকস ক্রিকেটার বাদশা। যিনি দেশের ক্রিকেটারদের মাঝে প্রথম বিশ্ব একাদশে খেলার কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। প্রথম বাংলাদেশ দলের চীফ মিশন হয়ে দলের সাথে গিয়েছিলেন সালাউদ্দিন ইউসুফ এবং ম্যানেজরের দায়িত্বে ছিলেন এনএ চৌধুরী.‘। সূত্র : নজমুল আমিন কিরন।

১৯৭৩ সালে মার্দেকা কাপে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের খেলোয়াড়বৃন্দ…

যাইহোক এরা সবাই ছিলেন ১৯৭৩ সালে মালয়েশিয়ার মার্দেকা ফুটবল প্রতিযোগিতায় সর্বপ্রথম বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে প্রতিনিতিধত্বকারী ফুটবল খেলোয়াড়। আগেই বলা হয়েছে যে-এদের মধ্যে অভিজ্ঞতা অর্জনকারী স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের জাকারিয়া পিন্টু, প্রতাপ শঙ্কর হাজরা, নওশেরুজ্জামান নওশের, তুর্য হাজরা ওরফে কাজী সালাহউদ্দিন, আব্দুল হাকিম, কায়কোবাদ, এনায়েতুর রহমান এনায়েত প্রমুখ ৭/৮ জন নিয়ে গঠিত হয় মার্দেকাগামী বাংলাদেশ জাতীয় দল। বাকিরা নতুন ফুটবল খেলোয়াড়।

শুধু তাই নয়, দলের সর্বপ্রথম অধিনায়ক ছিলেন জাকারিয়া পিন্টু। প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের প্রথম খেলা ছিল থাইল্যান্ডের বিপক্ষে। কোয়ালিফাইং ম্যাচে নির্ধারিত সময় ২-২ গোলে অমীমাংসিত ছিল। সর্বপ্রথম গোলদাতা ছিলেন বাংলাদেশের এনায়েত ও কাজী সালাহউদ্দিন।
পরে টাইব্রেকার কিক হয়। বাংলাদেশ ৩-২ গোলে জিতেছিল। আর ওটাই ছিল স্বাধীনতা পরবর্তী আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে বাংলাদেশের সর্বপ্রথম জয়।

দ্বিতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ ১-১ ভিয়েতনামের সাথে ড্র। বাংলাদেশের গোলদাতা মনোয়ার হোসেন নান্নু।

তৃতীয় ম্যাচে বাংলাদেশ ১-২ গোলে কুয়েতের কাছে পরাজিত হয়। বাংলাদেশের গোলদাতা এনায়েতুর রহমান এনায়েত।

চতুর্থ ম্যাচে বাংলাদেশ ১-১ সিঙ্গাপুরের সাথে ড্র…। বাংলাদেশের গোলদাতা কাজী সালাহউদ্দিন।

পঞ্চম ম্যাচে স্থান নির্ধারনীতে বাংলাদেশ ০-২ গোলে থাইল্যান্ডের কাছে হেরে যায়।

৫টি ম্যাচে ১টি জয়, ২টি পরাজয় এবং ২টি ড্র। সম্মানজনক লড়াই। এই দৃঢ়প্রত্যয়ে ছিল স্বাধীনোত্তর সেকালের বাংলাদেশের মনে।

মজার ব্যাপার হলো-তখন কিন্তু র্যাংকিং প্রথা চালু থাকলেও সেই সময়ের ফিফা এই মার্দেকা টুর্নামেন্টকে স্বীকৃতি দেয়ইনি। গুটি কয়েকটি উন্নত ফুটবল খেলিয়ের দেশকে নিয়ে সীমাবদ্ধতা রেখেছিল। তাছাড়াও বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বে এশিয়ার কোটা ছিল মাত্র একটি। চিন্তা করুন তাহলে! এই ছিল ১৯৭০ দশকের শুরুতে বাংলাদেশ ফুটবল দলের উজ্জল ভাবমূর্তি।

১.৩ ।। অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের কারণ…

বাংলাদেশ জয়লাভের কারণ দুটি। ষাট দশকের শেষভাগে ঐ পশ্চিম পাকিস্তান তথা পাকিস্তান জাতীয় ফুটবল দলের হয়ে বাংলাদেশের ২/৩ জন খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা অর্জন এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে মুক্তিযোদ্ধা তহবিল গঠনের লক্ষ্যে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল নামে একটি বাংলাদেশের ফুটবল দলটি ১৬টি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা।

কি ছিল স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ফলাফল…প্রাপ্তি বলতে অনেক। তারা ১৬ ম্যাচে ৯টি খেলায় জয়, ৪টি পরাজয় এবং ৩টি ড্র। তার সাথে প্রদর্শনী ফুটবল খেলা হতে ৫ লাখ রূপী সংগ্রহ করে তারা মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে জমা দিয়েছিলেন। কী বিস্ময়ের উদ্রেক করে বৈকি!

ঐ দু’টি আলাদা আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার সম্বলকে একটা এক্সপোজার স্তরে পৌঁছেছিলেন বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা। ধরে নিন তারা তখনকার সময় বাংলাদেশীদের হৃদয় অনেকটা আন্তর্জাতিক ভাব রূপ ধারণ করে নিয়েছিল। প্রতিটি খেলায় জয়লাভের মনোভাব ছিল। যার স্বভাবে বাংলাদেশী খেলোয়াড়ের হৃদয়ে জয়ী হওয়ার মজ্জাগত অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। সুবাদে বাংলাদেশের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়েরা পরবর্তী আন্তর্জাতিক ফুটবলের চোরাগুপ্তার রাস্তা চিনতে পেরেছিলেন। কোথায় কিভাবে ফুটবল খেলতে হয় তা তাদের জানা ছিল। সেকালের ফুটবলই ছিল এমন অবস্থার ফুটবল ঘরাণা। অনুকরণ নয়…অনুসরণ নয়..তারা প্রতিপক্ষ দেশের বিরুদ্ধে নিজস্ব বাঙালি ফুটবল ঘরাণার মতোই খেলে তাদের খেলা পরিবেশন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফলাফলে সম্পূর্ণ সফল না হলেও নিজেদের ক্রীড়া মুন্সিয়ানার ছাপ ছিল অবশ্যই প্রশংসার দাবীদার।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল তথা মুক্তিযোদ্ধা ফুটবল দলে কারা ছিলেন…এটা নিয়ে একটি খেলোয়াড় লেখা হলে বিতর্কের কারণ ঘটবে জানি। পরবর্তীতে এই বিষয়ের উপর একটা ফিচার লেখার ইচ্ছে রয়েছে।

পুরোপুরি ও সঠিক তথ্য পাওয়া না গেলেও সাম্প্রতিক কালের একটি বিশ্বস্থ সূত্র হতে জানা যায়। নিরপেক্ষভাবে লেখাটা এভাবে সন্নিবেশিত করা গেলো-সর্বপ্রথম অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু, সহ-অধিনায়ক প্রতাপ শংকর হাজরা, আলী ইমাম, মোহাম্মদ কায়কোবাদ, অমলেশ সেন, আইনুল হক, শেখ আশরাফ আলী, বিমল কর, শাহাজাহান আলম, মনসুর আলী লালু, তূর্য হাজরা (কাজী সালাহউদ্দিন), এনায়েতুর রহমান এনায়েত, কেএন নওশেরুজ্জামান নওশের, সুভাষ সাহা, ফজলে হোসাইন খোকন, আব্দুল হাকিম, তসলিম উদ্দিন শেখ, আমিনুল ইসলাম, আবদুল মমিন জোয়ার্দার, মনিরুজ্জামান পেয়ারা, মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার, প্রাণগোবিন্দ কুন্ডু, মুজিবর রহমান, মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) খন্দকার নুরুন্নবী, লুৎফর রহমান, অনিরুদ্ধ চ্যাটার্জী, সনজিত কুমার দে, মাহমুদুর রশিদ, সাইদুর রহমান প্যাটেল, দেওয়ান মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, বীরেন দাস বীরু, আবদুল খালেক ও নীহার কান্তি দাস প্রমুখ।

টিম ম্যানেজার : তানভীর মাজহার তান্না ও কোচ : ননী বসাক।

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের সর্বপ্রথম খেলোয়াড়দের হাত ধরে ফুটবলের যাত্রা শুরু….

এই সব বাঙালি খেলোয়াড়েরাই ছিলেন বাংলার মুক্তিপাগল সৈনিক। তাদের ভেতরে ভেতরে অনেক ক্ষোভ ছিল। জেদ ছিল। সংকল্প ছিল। দৃঢ়প্রত্যয় ছিল। ইচ্ছাশক্তি ছিল…সবমিলিয়ে অপূর্ব সম্মিলনের ফসল মার্দেকা কাপের উপর বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের প্রভাব পড়েছিল অনেক অনেক বেশি। যে কারণেই থাইল্যান্ডের সাথে ম্যাচ রিডিংয়ে ভালো ফল পেয়েছিলেন মালয়েশিয়ান মাঠে বাংলাদেশীরা।

১.৪ ।। তদন্ত :

১৯৭৩ সালে মার্দেকাগামী বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলকে নিয়ে যা যা ঘটনা ঘটেছে তা কখনোই ক্ষমা করার যোগ্য নয়। দল গঠন নিয়ে পূর্বের নির্বাচকমন্ডলীরা যে বিতর্কের আদ্যপান্ত ঘটনা ঘটিয়েছেন বর্তমান প্রজন্মরা ক্ষমা করেনি। করবে না। কেন যে ইস্ট এন্ডের মাঝমাঠের খেলোয়াড় আলমগীরকে সরিয়ে ওয়াপডার আরেক মাঝমাঠের খেলোয়াড় শরিফকে নেয়া হয়েছিল-এই প্রেক্ষাপটে এবং আবাহনীর সাইড ব্যাক জাহাঙ্গীর শাহ বাদশা-বিআইডিসির স্টপার জহুরুল-আবাহনীর উইঙ্গার অমলেশ ও মোহামডানের উইঙ্গার ওয়াজেদ গাজীকে না ডাকার জন্য সম্পূর্ণ দায়ী থাকবেন তৎকালীন নির্বাচকরা।

ইতিহাস বাংলাদেশ জাতীয় দলকে ক্ষমা করেছে, কিন্তু পূর্ব প্রজন্মের নির্বাচকদের কখনোই ক্ষমা করেনি বর্তমান প্রজন্মরা। সেকালের দল নির্বাচন নিয়ে অতীতে যে হুট-হাটের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, এই অনিয়মের সূত্রপাত জন্ম যখন শুরু হলো…সেই বিতর্কের রেশ এখনো বিদ্যমান রয়েছে। নইলে ইতিহাসের পাতা অন্যদিকে ঘুরে যেতো।

২ বছর পর ফের মার্দেকা কাপে ১৯৭৫ সালে। এটা নিয়ে পরবর্তীতে আরেকটা বিষয় লিখবো আশা করি। এখন এই দ্বিতীয়বারের মতো অংশ নেয়া পায় মার্দেকা কাপের বাংলাদেশ।

ঘটনার কাল আরো আছে। এরপরে বাংলাদেশ ফুটবলে একালের সার্বিক খেলার মান নিয়ে দফায় দফায় পর্যালোচনার ইচ্ছে রয়েছে।

সেকালের ফুটবল আসরে বাংলাদেশী খেলোয়াড়েরা বিশেষ করে ক্লাব স্তরের খেলোয়াড়েরা কিভাবে ফুটবল খেলা নিয়ে উপভোগ করেছেন এবং এই ফুটবল খেলাকে একটা নয় বহু সম্প্রসারণের লক্ষ্যের ধারে কাছে তারা খেলতেন কিনা সেটাও ভেবে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। এর বাইরে আরো তাদের জন্য অন্য অনেক কিছু সাফল্য-অসাফল্যের প্রসঙ্গে জটিলতা আসতে পারে। ব্যাখ্যায় আসতে পারে। অসমর্থিত সূত্রে আবার নাও মিলতে পারে।

অতীত অজানার বিষয় নিয়ে বর্তমান প্রজন্মদের জানিয়ে দেয়া খুব জরুরী। এ পর্যায়ে কিছু লেখার তাগিদ অনুভব করেন না। তবে কেউ কেউ করেন। সেটা বোঝা যায় নিকট অতীতে অর্থাৎ সেকালের সাবেক খেলোয়াড় জাকারিয়া পিন্টু-হাসানুজ্জামান বাবলুরা পড়েন। দেখেন। কিন্তু বলেন-তথ্যে বিরাট ভুল আছে। তারপর সব খালাস।

১৯৭৩ সালে মার্দেকা কাপে ওয়াজেদ গাজী এবং ১৯৮৩ সালে প্রেসিডেন্ট কাপে আবু ইউসুফ ছিলেন নির্বাচকদের কাছে সম্পূর্ণ উপেক্ষিত…..

১.৫ ।। অব্যর্থ ইতিহাস সেভাবে কথা বলে না…

একটা স্টোরি লিখতে হলে অনেক তথ্য বের করতে হয়। ঘাঁটতে হয় সত্তর দশকের অধুনালুপ্ত কালে দৈনিক পত্র-পত্রিকায়। কিন্তু সেগুলো আজকাল পাওয়া যায় না। কাগজ তো প্রিন্টের তৈরি। একদিনের প্রকাশে সেদিনই শেষ। ব্যস মাসশেষে কাগজ ফেরিওয়ালার নিকট কেজি দরে সস্তা দামে বিক্রি হয়ে যায় সেই সব মূল্যবান দলিলের খবর। এভাবে হারিয়ে যায় অনেক কিছুর সাক্ষর ও ঐতিহাসিক ঘটনার মূল বিবরণ (!?)। কিন্তু এই ইতিহাস কখনোই বিকৃত হয় না…বিকৃত হন আমাদের কম্ভকর্ণের দায়িত্বশীলরা?

হাতের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য এখন দুষ্প্রাপ্যই হয়েছে। নাই নাই নাই এমন রাজত্ব চলছে। কিছুটা স্মৃতিশক্তির উপর ধরেই এই লেখার অনুপ্রেরণার উৎস। স্মৃতিশক্তিই সম্বল। সেই যাইহোক-বর্তমান প্রজন্মকে না জানাতে পারলে পরের প্রজন্মরা পূর্বের প্রজন্মকে ক্ষমা করবে না-এটা নিশ্চিত। কিন্তু এনায়েত-বাবলু-মহসিন দাদারা এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকেন। আমাদের বড় দুঃখ হয় তারা এ নিয়ে তেমন গা করেন না। কিছুই লেখেন না। জানবো কেমন করে?

১.৬ ।। গ্রেট খেলোয়াড়েরা নিশ্চুপ থাকেন!

সাবেক সব্যসাচী ফুটবল খেলোয়াড়-সঙ্গীতজ্ঞ গোলাম সারোয়ার টিপু-হাল আমলের সাবেক খেলোয়াড় কাম কোচ সাইফুল বারী টিটু দাদারা তো গ্রেট খেলোয়াড় ছিলেন এটা বাংলার জাতিরা জানেন। তারা মুখে বলে দেন আর রাজধানীর ক্রীড়ালেখকরা অনুলিখন হিসেবে কাজ করেন। সত্তর-আশির দশকে বহু জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় তাদের বলায় ঐ অনুলিখনে প্রকাশিত হয়েছে। নিজেদের ফুটবল খেলার অতীত ইতিহাসটুকু জানিয়ে দেন। ব্যস, ঐ পর্যন্ত।

আবার তারা আমাদের তথ্যকে কিছুটা সংশোধন ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন বলে মনে হয় না। কারণ-তারা প্রত্যেকেই ছিলেন বড় মাপের সাবেক ফুটবল খেলোয়াড়। তাদের অহংবোধ তো থাকবেই। তাদের যে দায়িত্ব রয়েছে এটা ভুলে যান। মিডিয়াকে মুখে বলা এক জিনিস এবং ইতিহাস মূলে একটা স্টোরি লেখা আরেক জিনিস। এরা বুঝতে চান না…বোঝার চেষ্টা করেন না। এটা খুবই দুঃখজনক। দুই প্রজন্মের মাঝখানে একটা ভুল বুঝাবুঝির নামান্তর।

’৭০ দশকে বাংলাদেশী তথা সাবেক কীর্তিমান ফুটবল ফুটবল খেলোয়াড়দের সাফল্য-অসাফল্যের শিরোনাম অবশ্যই আছে এবং থাকবে। সেই হারিয়ে যাওয়া খবরের অংশগুলো সংক্ষেপে লেখা হয়েছে। এখানে কিছু কিছু অদৃশ্য ঘটনাও ঘটেছে যা লেখা হয়নি। যা ঘটলেও কোনোদিন তথ্যের উদ্ঘাটন করা হবে না। বিষয়বস্তু তো সঠিকই রয়েছে। বর্ণনার বিস্তার অনেক বড়। কাজেই ছোট কথায় এখানে পোস্ট মর্টেম করা হয়েছে মাত্র।

১.৭ ।। সেরেব্রামের কোষে কোষে চন্দ্রবিন্দু জমে….

অজানাকে জয় করবার উদ্দেশ্য নিয়ে আজকের প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে। করছেও তাই। অতীতকে তারা ভুলে গেলেও কালকের ঘটনা নিয়ে তারা ভুলবেন না-এর নিশ্চয়তা কী! মাঠে-ময়দানে ঘটে যাওয়া অনেক অজানা রহস্যের জটকে খুলে দিতে এই প্রতিবেদনের মূল লক্ষ্য। কাজেই লেখার ভেতরে অনেক ফাঁকফোকর থাকা খুব স্বাভাবিক। এখানে এটা নিয়ে কোনো প্রদোষের কারণ ঘটবে বলে মনে হয় না। এ ব্যাপারে ক্ষমাপ্রার্থী আমরা সবাই।

আসলে জানার ইচ্ছাকে প্রকাশের মাধ্যম হলো মিডিয়ার অনলাইন। সেকালের ঢাকা ফুটবল খেলার উপর গণমাধ্যমে প্রকাশে না ছিল ইন্টারনেট। না ছিল মোবাইল। না ছিল থ্রিডি যুগ। সবকিছু ছিল না তা কিন্তু নয়। সত্তর দশকের আশ্চর্য যন্ত্র তো ছিলই-ঐ মানের এনালগ যুগে সর্বোচ্চ টেলিফোন টেলিগ্রাম, টেলিগ্রাফ, সাদা-কালো টিভি, মনোগ্রাম বক্স, প্রেক্ষাগৃহ (সিনেমা হল), যাত্রা নাটক এবং টেলিস্কোপ।

বলতে পারেন ঐ কালের ঢাকার ফুটবল খেলোয়াড়েরা ছিলেন এনালগ যুগ। হৃদয়ে ঢেকে যাওয়া ঐকালের ফুটবল কেমন ছিল? তারা কেমন খেলতেন? এই প্রশ্ন সকলের। বিশেষ করে ঢাকার ক্লাবগুলো কেমন ছিল? সুযোগ-সুবিধা কি ছিল? সব মিলিয়ে যন্তর মন্তর প্রশ্নগুলো ছিল ভিনদেশী মঙ্গলগ্রহের মতোই।

১৯৮৩ সালে তৃতীয় গোল্ডকাপে বাংলাদেশ লাল দলের খেলোয়াড়েরা….

১.৮ ।। ১০ বছর পর….১৯৮৩ সাল…

আগের সেই ১৯৭৩ সালের বাংলাদেশ জাতীয় দলের কাজী সালাহউদ্দিন বাদে সব খেলোয়াড়েরা আর নেই। সাবেকীর ঠিকানায় চলে গেছেন তারা। ১০ বছর বাদে যারা আসছেন সব নতুন এবং দ্বিতীয় প্রজন্মের নতুন ফুটবল তারকা। আগের সব অভিজ্ঞতাকে সলিল সমাধি হয়ে যাওয়ায় ফের নতুন ইঙ্গিতে নয়া অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ন করতে হয়েছে নয়া খেলোয়াড়দের…এক প্রজন্ম চলে যায়…আরেক নতুন প্রজন্ম আসে। বাস্তবতা এই। অভিজ্ঞতার সঞ্চয়ন তথা ফুটবল খেলার এক্সপোজারের ধার ধীরে ধীরে কমতে থাকে….আবার নতুন করে নয়া এক্সপোজার পেতে হাপিত্যেশ দিন কাটিয়ে দ্যায়।

তৃতীয় প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা, ঢাকা জাতীয় স্টেডিয়াম।

বাংলাদেশ লাল দলের হয়ে প্রাথমিকভাবে ডাক পেয়েছিলেন যারাঃ- গোলকিপার মহসীন (মোহামেডান), গোলকিপার সাঈদ হাসান কানন (ব্রাদার্স), আজমত (মোহামেডান), রণজিত (মোহামেডান), আবুল হোসেন (মোহামেডান), মনি (আবাহনী), ইমতিয়াজ সুলতান জনি (আবাহনী), আশিষ ভদ্র (আবাহনী), খুরশীদ বাবুল অধিনায়ক (আবাহনী), কাজী সালাহউদ্দিন (আবাহনী), আশরাফউদ্দিন চুন্নু (আবাহনী), সম্রাট হোসেন এমিলি (আবাহনী), মনোয়ার বাবু (ব্রাদার্স), বাবুল (ভিক্টোরিয়া), ওয়াসিম ইকবাল (ব্রাদার্স), এজাজ (রহমতগঞ্জ),মনোয়ার হোসেন মনু (বিআরটিসি), ছোট লিয়াকত (সেনাবাহিনী), মাহমুদুল হক লিটন (ব্রাদার্স)।
প্রশিক্ষক-আবদুর রহিম। ম্যানেজার-এম আমিন। সহকারী ম্যানেজার-এসএ কালাম।

বাংলাদেশ সবুজ দলের হয়ে প্রাথমিকভাবে ডাক পেয়েছিলেন যারা-গোলকিপার আতিক (আবাহনী), গোলকিপার মঈন (রহমতগঞ্জ), স্বপন কুমার দাস, অধিনায়ক (মোহামেডান), মানিক (ব্রাদার্স), কামাল (ব্রাদার্স), ফুয়াদ (ব্রাদার্স), বড় কামাল (মোহামেডান), অলোক (মোহামেডান), বাদল রায় (মোহামেডান), বাতেন (রহমতগঞ্জ), আনোয়ার (আজাদ স্পোর্টিং), সালাম মুর্শেদী (মোহামেডান), জসি (মোহামেডান), আরিফ (ব্রাদার্স), আজিজ (দিলকুশা), ইলিয়াস হোসেন (ওয়ান্ডারার্স), জাফরুল্লাহ (ভিক্টোরিয়া), রঞ্জিৎ (বিআরটিসি), মুখতার (সেনাবাহিনী)।
প্রশিক্ষক-আবদুস সাদেক। ম্যানেজার-আব্দুল কাদের। সহকারী ম্যানেজার-এম আর সিনহা।

বাংলাদেশ জাতীয় দলকে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপে অংশ নেয়। অনেক ফুটবল খেলোয়াড় দলে ঠাঁই পেলেও মূল মাঠে খেলার সুযোগ পেয়েছেন অনেক কম। ডাক পেয়েছিলেন ঐ ঢাকার মাঠে ঘরোয়া হতে। খেলার নাম প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগ। এই ফুটবল লীগে যারা ভালো পারফরমেন্স করবেন তাদেরকেই ডেকেছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচকমন্ডলীরা।

১.৯ ।। আবারো সেই উপেক্ষার প্রমাদ…
সেই সময় বাঘা বাঘা ফুটবল খেলোয়াড়েরা ঢাকা ফুটবল লীগে ভালো খেলা সত্ত্বেও চরম উপেক্ষার শিকার হয়ে নির্বাচকমন্ডলীর অনুগ্রহ লাভ থেকে বঞ্চিত হন দেশবরেন্য আবাহনীর স্টপার আবু ইউসুফ, ব্রাদার্স ইউনিয়নের বাদলসহ আরো অনেকে। দেশবাসী এই নিয়ে অনেক ক্ষোভ সঞ্চার করেছে। উষ্মা প্রকাশ করেছে দল নির্বাচন নিয়ে। একদম বাজে অবস্থা। ক্লাবের তরফে দুঃখ হতাশার শেষ ছিল না। বাংলার ক্রীড়ামোদীরা বোধ হয় অতৃপ্ত বেশি পেয়েছিলেন প্রিয় খেলোয়াড়দের বাংলাদেশ দুটি দলের প্রাথমিক স্কোয়াডে ডাক না পাওয়া নিয়ে। ইতিহাস আবারো লজ্জা দ্যায় ঐ সময়ের নির্বোধ নির্বাচকগোষ্ঠীদের উপর। কিন্তু গোষ্ঠীরা লজ্জাবোধ করে না।

স্বাগতিক বাংলাদেশ লাল দলকে খ গ্রুপে রেখে অন্য দেশগুলো ছিল-ইরাক, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড ও নেপাল এবংস্বাগতিক বাংলাদেশ সবুজ দলকে ক গ্রুপে রেখে অন্যান্য দেশগুলো ছিল-গতবারের চ্যাম্পিয়ন চীন, মালয়েশিয়া, ভারত ও ইংল্যান্ডের মিডলসেক্স ওয়ান্ডারার্স ক্লাব।

১.৯ ।। বাংলাদেশ সবুজের ছত্রখান পরাজয়…

এইবার আপনাদের পড়তে হবে দৈনিক সংবাদ হতে ডকুমেন্টের কিছু অংশ লেখা-পড়ুন তাহলে…
তারিখটা ছিল-২৫শে আগস্ট ১৯৮৩ সাল। দিনটা ছিল বৃহস্পতিবার। তখনকার সামরিক আইন শাসক জেনারেল এরশাদের আমল।
‘আজ বহু প্রতীক্ষিত তৃতীয় প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ শুরু হচ্ছে…বিকেল সাড়ে ৫টায় স্টেডিয়ামের সবুজ চত্বরে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি এএফএম আহসানউদ্দিন চৌধুরী এই টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করবেন।’

‘৮টি বিদেশী দলসহ ১০টি দলের মধ্যকার পক্ষকাল ব্যাপী এই টুর্নামেন্টে বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দল অংশ নিচ্ছে।’

‘উদ্বোধনী খেলায় মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ সবুজ এবং পরের খেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে গতবারের (১৯৮১) দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ড।’

১.১০ ।। উদ্বোধনীর দিন…

তৃতীয় প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী খেলায় মালয়েশিয়া বাংলাদেশ সবুজ দলকে ২-১ গোলে হারিয়েছে।’

‘আজ সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত এই খেলার প্রথমার্ধে উভয় দল একটি করে গোল দেয়…দুই দলের খেলার মান ও ধারা অনুযায়ী ফলাফল ১-১ গোলে ড্র বা সবুজ দলের জয়ী হওয়া উচিত ছিল…কিন্তু জসি ও গফফারের ব্যর্থতা জয়কে যেমন হাতছাড়া করেছে, তেমনি ছোট কামালের ভুল পাস দলের পরাজয় ডেকে আনে।’

প্রেসিডেন্ট গোল্ডকাপে মালয়েশিয়ার গোলরক্ষক কৃষ্ণমুর্তি পাঞ্চ করেন বাংলাদেশ সবুজের জসির মাথার উপর দিয়ে….

২.০ ।। কেমন ছিল বাংলাদেশ সবুজ দলের খেলা?

‘সবুজ দল জেতার মতো খেলেনি…খেলোয়াড়দের ব্যর্থতা এবং খেলায় ভুল-ভ্রান্তির ফলে এই দলকে কখনো শক্তিশালী বা সংগঠিত হতে দেয়নি…এর সঙ্গে প্রত্যেকের ‘একলা চলননীতি’ যোগ হয়ে ব্যর্থতার ষোলকলা পূর্ণ করে…তবুও বেশি গোলে না হারার কারণ গোলরক্ষক মঈন, দলনায়ক স্বপন ও বড় কামালের র্দঢ়তা…এরা শক্তি ও সংহতি বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেছেন…কিন্তু অপর ৮ জনের ব্যর্থতার গ্লানি মুছা সম্ভব হয়নি….দলগত সমঝোতা, পাসিং এবং আক্রমণ রচনা সবদিক দিয়েই সবুজ দল নিরাশ করেছে…যার ফলে একটি মাঝারি দল হয়েও মালয়েশিয়ারা জয়ের আনন্দ নিয়ে ফিরেছেন…তাদের ফুটবল সেন্স বেশ টনটনে হলেও টেকনিকে তেমন উন্নত নয়…তবে শারীরিক দিক দিয়ে বেশ শক্ত সামর্থ্য….এতদসত্ত্বেও দুই দলের নিম্নমানের খেলা, বৃষ্টি ভেজা মাঠে তথা স্টেডিয়াম গ্যালারিতে প্রায় ৪০ হাজার দর্শকের মন ভরতে পারেনি।’

২.১ ।। গোল করার বর্ণনা….

সবুজ দল হারলেও গোলের সুযোগ পেয়েছে প্রথমে…ইলিয়াসের পাস থেকে অলোক এই সুযোগ পেয়ে গোলে গ্রাউন্ড শট নেন…কিন্তু মালয়েশিয়ার গোলরক্ষক কৃষ্ণমুর্তি প্রস্তুত ছিলেন…এর একটু পরেই মালয়েশিয়া গোল পায়…একটি আক্রমণ থেকে আজিজুলের শট বারে লেগে ফেরত আসলে রাজিফ সহজেই গোল করেন (১-০)…
২৮ মিনিটে কামালের একটা মাপা লব গেলে ঢোকার সময় গোলরক্ষক কৃষ্ণমুর্তি কোনোমতে বাঁচালেও ৪৪ মিনিটে গোলশোধ হয়…সালাম মুর্শেদীর ক্রস থেকে গফফার গেল দেন (১-১)…
বিরতির পর দুই দল কয়েকবার বিচ্ছিন্ন আক্রমণ চালায়…এর মধ্যে একবার জসি ওপেন নেট পেয়েও শট নিতে ব্যর্থ হলে গাফফার বল পান এবং জোরে শট নিতে গিয়ে বাইরে মারেন…অবশেষে ৩৪ মিনিটে লেফট ব্যাক কামাল বল মাঝমাঠে না ফেলে রাইট ব্যাককে দিতে গিয়ে ভুল পাস করলে মালয়েশিয়ার লেফটব্যাক মানজামান বল পেয়ে ক্রস পাস দেন…তা থেকে নাসির গোল করেন (২-১)…

হলুদ কার্ড খান বাংলাদেশের গোলরক্ষক মঈন ও মালয়েশিয়ার নাসির ও ইউসুফ…।

মালয়েশিয়া : গোলকিপার কৃষ্ণমুর্তি-১, মানজামান-১৫, ধর্মলিঙ্গম-২, জুলফিকলি আলী-৫, রবিন্দ্রম-৬, আজিজুল-৮ (আবদুল্লাহ-১৪), লাহাদ দাতুক-৩, নাসির-১০ (ইউসুফ-৭), রাজিফ-৯, আজলান-১১ ও করিম-১৩।

বাংলাদেশ সবুজ : গোলকিপার মঈন, মানিক, বাতেন, স্বপন, ছোট কামাল, বড় কামাল, অলোক (ফুয়াদ), গফফার, সালাম (আরিফ), ইলিয়াস ও জসি।

রেফারি : ইউ জং রিন (দক্ষিণ কোরিয়া)। সহকারী রেফারি : মাথু শ্রেষ্ঠা (নেপাল) ও হীরন কংতিয়ান (থাইল্যান্ড)…।

এই ছিল প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ান যুব দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ সবুজ দলের ক্রীড়া অনুশীলনীর ইতিহাস!

আসলে একটাই স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের হৃদয়ের আকাশে বাতাসে ঐ এশিয়ার শীর্ষস্থানে পৌঁছে যাওয়া। অনেক স্বপ্নের মাঝেও অনেক চমকপ্রদ ফলাফল ধরা দিয়ে যাচ্ছিলো প্রতি মুহূর্তে। কিন্তু কোথায় কী…!

(চলবে)..

ছবির সংগ্রীহিত : নজমুল আমিন কিরন, ক্রীড়া সাংবাদিক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here