দ্যা চোকার্স

0
156

বিশ্বকাপের ছোঁয়া পাওয়া প্রত্যেক ক্রিকেট দলের জন্যে স্বপ্নের মতো। কিন্তু বিশ্বকাপই যদি ওই দল থেকে দূরে সরে থাকে,তাহলে দলটি লড়াই করেও তার দেখা পায় না।বিশ্বকাপ স্বয়ং নিজেই যেনো লুকোচুরি খেলায় মর্ত হয়েছে।হ্যাঁ আমি ক্রিকেট বিশ্বকাপে হতভাগ্য দল দক্ষিণ আফ্রিকার কথা বলছি।বিশ্বকাপে মতো মঞ্চে তাদের সাথে খনার একটি বচন খুবই সংগতিপূর্ণ।বচনটি হলো-“কপালে নাই তো ঘি,ঠকঠকালে হবে কি”। তাদের ক্রিকেট বিশ্বকাপ আর নেদারল্যান্ডসের ফুটবল বিশ্বকাপ ভাগ্য যেনো একই সূত্রে গাঁথা।দুইদলেরই তীরে এসে ভরাডুবি ঘটে।তারা যেনো ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের শিকারমাত্র।

১৯৭৫ সালে ইংল্যান্ডে ১ম বিশ্বকাপ আসর বসে।তখন কেবলমাত্র একটি দেশই এইরকম আয়োজনের খরচ বহন করতে পারতো।১৯৭৫ সালে বিশ্বকাপ শুরু হয়েছিলো জুনের ৭ তারিখ থেকে।তখনকার সময় প্রত্যেকটা দল ৬০ ওভার করে খেলতো,প্রতি ওভারে ছিলো ৬ বল।সাধারণ দিনের আলোতে খেলা হতো এবং খেলোয়াড়েরা সাদা জার্সি পরে লাল বল দিয়ে খেলতো।

এরপর যখন ক্যারি পেকার বিশ্বকাপ শিরোপা এলো,তখন ঐ খেলার মাত্রা পরিবর্তন হলো।ক্রিকেট বিশ্ব জানলো সীমিত ওভারের খেলা সম্পর্কে।এরপর প্রতি চার বছর পরপর বিশ্বকাপ আসর বসে।এবারও ইংল্যান্ডে বসতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের ১২ তম আসর।এই বিশ্বকাপের অন্যতম দাবিদার দক্ষিন আফ্রিকাকে নিয়ে আজকের আলোচনা।

১৯৭৫ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত দক্ষিন আফ্রিকা ক্রিকেটের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিলো আইসিসির।২২ বছরের নির্বাসন থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেই ১৯৯২ সালে তারা প্রথম বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে উঠার গৌরব অর্জন করে।কিন্তু সেমিফাইনালে লড়াইয়ে ইংল্যান্ডের সাথে হেরে যায়।ক্রিকেট বিশ্বে নিজেদের ‘চোকার্স’ হিসেবে পরিচিত করানোর শুরু সেখানেই।

১৯৯৬ সালে গ্রুপ পর্বে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে দক্ষিন আফ্রিকা।নিজেদের সেরাটা ঢেলে দিলেও তাদের দৌড় থেমে যায় কোয়ার্টার ফাইনালে।১৯৯৯ সালে বিশ্বকাপে আবারও সেমিতে ওঠে প্রোটিয়ারা।কিন্তু সেবারও আস্ট্রেলিয়ার সাথে অবাক করা টাই।করুণভাবে বিদায় নিতে হয় প্রোটিয়া বাহিনীকে।

২০০৩ সালে বিশ্বকাপে তাদের পারফরম্যান্স ছিলো খুবই হতাশাজনক।তারা বিদায় নেয় গ্রুপ পর্ব থেকে।২০০৭ সালে তারা সেমিতে উঠে।আগের ম্যাচগুলো বেশ ভালোই খেলেছিলো,কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার সাথে হারে তাদের বিদায় ঘন্টা বাজে।২০১১ সালের বিশ্বকাপে হট ফেভারিট হিসেবে অংশ দক্ষিন আফ্রিকা।কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের সাথে পরাজয়ে জয়ের রথ থেমে যায়।২০১৫ এর বিশ্বকাপেও তাদের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নিউজিল্যান্ড।এবারে ছিলো সেমিফাইনাল পর্ব।কিন্তু ডাক-ওয়ার্থ লুইস পদ্ধতি ওই ম্যাচ কিইউরা ৪ উইকেট জয় লাভ করে,আর প্রোটিয়ারা হতাশা নিয়ে বাড়ি ফিরে।

বিশ্বকাপে সাফল্যের দিক দিয়ে হয়তো দক্ষিন আফ্রিকা ভাগ্যের সহায় পায় নি।কিন্তু লড়াই করে মুগ্ধ করেছে ক্রিকেট বিশ্বকে।প্রতিবারের মতো এবারও তারা যোগ্য প্রতিপক্ষ দলে যেমন রয়েছে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্লেয়ার তেমনি রয়েছে তরুণ তুর্কিদের প্রতিভার সমন্বয়।

দলের টপ অর্ডারে দায়িত্ব পালন করবেন অধিনায়ক ফাফ ডু প্লেসিস,হাশিম আমলা,ডি-কক।যদিও ডি-কক এখন একটু অফ ফর্মে আছেন।তবুও তিনি প্রতিপক্ষের বোলারদের জন্যে ত্রাস হয়ে দাড়াতে পারেন।এছাড়া ডু প্লেসিসের মতো মারকুটে ব্যাটসম্যানের ভূমিকাও দলে থাকবে।এছাড়া স্ট্রাইক রোটেট করে দলকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হাশিম আমলাও ব্যাটিং এ তৎপর হবেন।

মিডল অর্ডারে থাকবে অভিজ্ঞ অলরাউন্ডার জে পি ডুমিনি।তার ব্যাটিং স্টাইলের উপর যেমন প্রোটিয়ারা আস্থা রাখবে ঠিক তেমনি বোলিংয়েও আস্থা রাখবে।এছাড়া থাকবে আরেক মারকুটে ব্যাটসম্যান ডেভিড মিলার।তার মারমুখী ব্যাটিং প্রতিপক্ষের জন্যে দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়াবে।মিডল অর্ডারে প্রোটিয়ারা এইডেন মারক্রামকে চাইবে।কারণ তিনি ভালো স্ট্রাইক রোটেট করে দলের প্রতিকূল পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবেন।তাছাড়া থাকবে বোলিং অলরাউন্ডার আন্ডিল ফেহলুকাওয়ে।

লোয়ার অর্ডারে থাকবে আরেক বোলিং অলরাউন্ডার ডোয়াইন প্রিটোরিয়াস।আর বোলিংয়ে নেতৃত্ব দিবে প্রোটিয়াদের তিন স্তম্ভ ডেল স্টেইন,ইমরান তাহির,কাগিসো রাবাদা।প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের রাতের ঘুম হারাম করতে এই ত্রয়ীর একজনই যথেষ্ট।

বিশ্বকাপ স্কোয়াড:

১.ফাফ ডু প্লেসিস(অধিনায়ক)
২.হাশিম আমলা
৩.কুইন্টন ডি কক
৪.জে পি ডুমিনি
৫.ডেভিড মিলার
৬.এইডেন মারক্রাম
৭.আন্ডিল ফেহলুকাওয়ে
৮.ডোয়াইন প্রিটোরিয়াস
৯.ডেন স্টেইন
১০.ইমরান তাহির
১১.কাগিসো রাবাদা
১২.লুঙ্গি এনডিগি
১৩.তাব্রিজ শামসি
১৪.রশি ভ্যান ডার ডুসেন
১৫.আনরিচ নর্টিজ

প্রতিপক্ষকে সামলানোর এই স্কোয়াডের প্রতিটি ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু তাদের মধ্যে তিন জন খেলার পরিস্থিতি মুহুর্তে পরিবর্তন করেন দিতে পারে তারা হলো ফাফ ডু প্লেসিস,হাশিম আমলা এবং ডেল স্টেইন।

ফাফ ডু প্লেসিস
এবারের বিশ্বকাপ মিশনে প্রোটিয়াদের ঝান্ডা থাকবে প্লেসিসের হাতে।সেইসাথে প্লেসিস চাইবে ভালো কিছু করে নিজের কীর্তি তৈরী করতে।এবার সাউথ আফ্রিকানদের টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান হিসেবে ভূমিকা রাখবেন তিনি।তিনি যেমনভাবে স্ট্রাইক রোটেট করে খেলতে পারেন ঠিক তেমনি দলের প্রয়োজনে আক্রমণাত্মকও হয়ে উঠতে পারেন।বর্তমানে ওডিআই র‍্যাংকিয়ে তার অবস্থান ৫ এ।ওডিআইতে ১৩৪ ম্যাচে ৪২টি অর্ধশতক ও ১১টি শতকের মাধ্যমে ৫১২০ রান প্লেসিসের কাছে প্রোটিয়া সমর্থকদের আশা ভরসা একটু বেশীই থাকবে।এছাড়া তার আগের অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতা থাকার কারণে বিশ্বকাপ দলীয় এবং ব্যক্তিগত সমস্যার সম্মুখীন হবেন না।আর সেই সাথে অতীত অভিজ্ঞতা থাকার কারণে বিশ্বকাপে ভালো কিছুই করবেন।
হাশিম আমলা
হাশিম আমলা দক্ষিণ আফ্রিকার উদ্বোধনী ডানহাতি ব্যাটসম্যান।সাউথ আফ্রিকানদের মধ্যে ওডিআইতে তার পারফরম্যান্স প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য।এছাড়া তিনি দ্রুততম ৩০০০ রান করেন।আগের রেকর্ড-এর অধিকারী ভিভ রিচার্ড়ের থেকে ১২ ম্যাচ কম খেলে।দ্রুততম ৪০০০ ও ৫০০০ রানের রেকর্ডও তার দখলে।বর্ণময় ওডিআই ক্যারিয়ারে ১৭৪ ম্যাচে ৪৯.৭৫ গড়ে ৭৯১০ রান করা এই প্লেয়ার এবারের বিশ্বকাপে সেরা ব্যাটসম্যানদের তালিকায় উপরে উঠে

এসেছেন
ডেল স্টেইন
ক্রিকেট বিশ্বের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলার ডেল স্টেইন।গতির রাজা এ বোলার ১৫৫ কি.মি. বেগে বল করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন ক্রিকেট বিশ্বকে।বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ৪৩৯টি টেস্ট এবং ১৯৬ টি ওয়ানডে উইকেট নিয়েছেন।তিনি সাউথ আফ্রিকা দলের সবচেয়ে দ্রুত ৫০,১০০,১৫০,২০০ উইকেট শিকারী।গত বিশ্বকাপেও তার পারফরম্যান্স ছিলো প্রশংসনীয়।তিনি গত বিশ্বকাপে ৮ ম্যাচে ১১ উইকেট নেন।এবারের বিশ্বকাপেও বোলিং নেতৃত্বে তিনি প্রধান ভূমিকা পালন করবেন।তাই দক্ষিন আফ্রিকার বোলিং শক্তির প্রধান কান্ডারি বলা চলে এই সেরা বোলারকে।

লেখকঃ মোঃ সরোয়ার জাহান সজিব

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here