তারকার জন্ম ও বুমেরাং বুমরায় মেলবোর্নে জয় হে

0
186
কলকাতা প্রতিনিধি: সাঁইত্রিশটা বসন্ত ! ঠিক সাঁইত্রিশটা বসন্ত লাগল এমসিজি-র বাইশ গজে টিম ইন্ডিয়ার টেস্ট জয়ের শাপমুক্তি ঘটাতে। শেষ যেবার ইয়ারা নদীর ধারে ভারতীয় সুর্যোদয় ঘটেছিল তখন ক্যাপ্টেনের নাম সুনীল গাওস্কর। টিভি , মোবাইল ফোন , স্যোশাল মিডিয়া এসব কী বস্তু ; খায় না মাথায় দেয় ভারতবাসীর কাছে তা অজানা , বার্লিন প্রাচীর অক্ষত , সোভিয়েত ইউনিয়ন নামক একটি দেশ তখনও বর্তমান , বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক উদারীকরন ঘটেনি এবং সর্বোপরি ভারতবর্ষ তখনও ক্রিকেটে বিশ্বজয়ের স্বাদ পায়নি।
আজ এমসিজির পিচে অস্ট্রেলিয়াকে ১৩৭ রানে বিপর্যস্ত করে অধিনায়ক বিরাট কোহলি যখন মুষ্ঠিবদ্ধ হাতটা গ্যালারির দিকে ছুঁড়ছিলেন দেখে বিস্ময় জাগছিল। সত্যিই কী তাই ! ৩৭টা বছর লেগে গেল এমসিজিতে টেস্ট জয়ের স্বাদ নিতে? এই ৩৭ বছরে তো কম রথী-মহারথীর জন্ম দেয়নি ভারতীয় ক্রিকেট। সচিন-সৌরভ-দ্রাবিড়-লক্ষ্মণের তারকাখচিত টিমও তো এই স্বাদ থেকে বঞ্চিত। এবং রবিবাসরীয় সকালে ৩৭ বছরের জ্বালা জুড়োনো মেলবোর্নীয় রূপকথা যাদের হাত দিয়ে লেখা হল তাঁদের জীবনটাও তো কম রূপকথা মন্ডিত নয়। ময়াঙ্ক আগরওয়াল , জসপ্রীত বুমরা মিশন মেলবোর্নের দুই অবিসংবাদিত চরিত্র। কেউ কেউ হয়তো বলবেন পূজারার সেঞ্চুরি বা কোহলির লড়াকু ৮২-ও নায়কত্বের দাবিদার। অবশ্যই , কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু বক্সিং ডে-র সকালে ভারতীয় ক্রিকেটাকাশে নবতারার জন্ম ক্রিকেট রোম্যান্টিসিজ্মের কাছে অনেক বেশি চোখে লাগে। উপেক্ষিত নায়কের জবাবী ৭৬ তাই অবশ্যই শ্রেষ্ঠত্বের তাজের দাবি রাখে | ঘরোয়া ক্রিকেটে ঝুড়ি ঝুড়ি রান করেও ময়াঙ্ক অাগরওয়ালকে দেখতে হয়েছে তার থেকে কম রান করা অনেকে অবলীলায় ভারতীয় ড্রেসিংরুমের টিকিট পেয়ে যাচ্ছেন , যেন এটাই তাঁর ললাট লিখন।
অতীতে রাহুল দ্রাবিড়কে অনেকটা এই যন্ত্রনাক্লিষ্ট ভাগ্য বিড়ম্বনার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। মনে করা হত সচিন-সৌরভের মতো ভারতীয় ক্রিকেটে দুই সূর্যের মাঝে যথেষ্ট উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়েও রাহুল দ্রাবিড় সাধারন ক্রিকেট রসিকদের চোখে ততটা দৃষ্টিগোচর হননি যতটা তাঁর হওয়ার কথা ছিল। ময়াঙ্ক আগরওয়াল সমন্ধে ঘরোয়া ক্রিকেটে অভিযোগ ছিল তিনি যথেষ্ট পরিশ্রমী নন , শরীরে বাড়তি মেদ ঝরাতে তিনি যথেষ্ট খাটেননা। কিন্তু গত দু-তিন বছরের কঠোর পরিশ্রমে এই বদনাম তিনি ঘুচিয়ে দিয়েছেন। এখন কর্ণাটক ড্রেসিংরুমে কান পাতলে শোনা যাবে ছেলেটা ক্রিকেট নিয়েই বাঁচে , ক্রিকেট নিয়েই ঘুমোতে যায়। শোনা গেল ময়াঙ্কের এই খোলনলচে বদলে দিতে বিশেষ সহযোগী ছিল তাঁর বাবার কাছে শেখা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের এক বিশেষ ধ্যান। বক্সিং ডে-র সকালে স্টার্ক-কামিন্সদের একের পর এক গোলাগুলি পিচ কামড়ে পড়ে থেকে যেভাবে সামাল দিচ্ছিলেন এক এক সময় সত্যিই তাঁকে ধ্যানমগ্ন যোগী মনে হচ্ছিল। অথচ অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটকুলের কেউ কেউ তাঁর এই ইনিংসকে কটাক্ষ করতে ছাড়লেন না । ঘরোয়া ক্রিকেটে রেলওয়েজের বিরুদ্ধে ময়াঙ্কের ৩০৪ রানের ইনিংস নিয়ে ধারাভাষ্যকার ও’কিফ তো বলেই বসলেন কোনো রেলওয়ে ক্যান্টিন স্টাফদের টিমের সঙ্গে করেছে বোধহয়। এই মন্তব্যের জন্য পরে তিনি ক্ষমা চেয়ে নিলেও কোচ রবি শাস্ত্রী পাল্টা দিলেন সে দিনের খেলা শেষে স্টুডিওতে যখন বললেন ও’কিফ তুমি ক্যান্টিন খুললে ময়াঙ্ককে তার ফোন নম্বরটা দিও , ও সেখানে গিয়ে তোমার ক্যান্টিনের কফির ঘ্রান নিতে চায় যাতে বুঝতে পারে তোমার ক্যান্টিনের কফি না আমাদের দেশের ক্যান্টিনের কফি কোনটা শ্রেষ্ঠ।
এমনিতে মেলবোর্ন টেস্ট জুড়ে দুই দলের ক্রিকেটারদের ঠোকাঠুকি প্রায়শই চলছিল। কখনও রোহিত বনাম টিম পেইন কখনও বা টিম পেইন বনাম ঋষভ পন্থ। এমসিজির কুখ্যাত ১৩-বে স্ট্যান্ড থেকে কটুক্তি হজম করতে হয়েছে স্বয়ং বিরাটকেও | যার জবাব রবিবাসরীয় সকালে টিম বিরাট মুখে দেয়নি ম্যাচে দিয়েছে। মেলবোর্ন রুপকথার আর এক বর্ণময় চরিত্র জসপ্রীত বুমরা। যিনি গোটা ম্যাচে নয় উইকেট নিয়ে গেলেন তাঁর জীবনটাও তো কম সিনেমাটিক নয়। মায়ের ঘুম ভেঙ্গে যাবে বলে ছোট্ট বুমরাকে মা নির্দেশ দিয়েছিলেন বল করবে করো কিন্তু যেন শব্দ না হয়। শব্দ না করে বোলিংয়ের এক অভিনব পন্থা আবিস্কার করে ফেলেছিলেন সেদিনের কিশোর বুমরা | মেঝে ও দেওয়ালের সন্ধিস্থলে বলটাকে ফেলো। তখন কেই বা ভেবেছিল মায়ের ঘুমের জন্য করা বল একদিন বিশ্বের তাবড় তাবড় ব্যাটসম্যানদেরই ঘুম কেড়ে নেবে। প্রথম ইনিংসে শন মার্শকে আউট করা সেই স্লোয়ার ইয়র্কার যার উৎকৃষ্ট উদাহরন।
বুমরাকে নিয়ে তাঁর আবিষ্কর্তা জন রাইটকেও বেশ উচ্ছ্বসিত শোনাল। মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের কোচ ও স্পষ্টার হিসেবে আমদাবাদে একটি ঘরোয়া ম্যাচ দেখতে গিয়ে প্রথম বুমরাকে দেখেন তিনি। ছেলেটার একটি গোলার মতো বাউন্সার উইকেটরক্ষক পার্থিবের মাথার ওপর দিয়ে বাই চার হয়ে যায়। তৎক্ষনাৎ খোঁজখবর নিয়ে বুমরাকে মুম্বই ইন্ডিয়ান্সে সই করান তিনি। যদিও বুমরার নায়ক হওয়ার পিছনে আজ কোনো অজি ব্যাটসম্যান বাধা হয়ে দাঁড়াননি। একমাত্র বাধা হিসেবে উপস্থিত হয়েছিল বৃষ্টি। প্রবল সংশয়াক্লিষ্ট দেখাচ্ছিল ভারতীয় ড্রেসিমরুমকে। এভাবে বাগে পেয়েও অজি সংহার না করতে পারা তো বাঘের মুখ থেকে শিকার ছিনিয়ে নেওয়ার শামিল। যদিও সকালে এক অস্ট্রেলীয় ফ্যানের টুইট দেখে অবাক হতে হল। তাঁর মতে অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে চূড়ান্ত লজ্জাজনক হবে যদি বৃষ্টির জন্য তাঁরা টেস্ট বাঁচিয়ে দেয়। এই টেস্ট জয় ভারতেরই প্রাপ্য। এক এক সময় চূড়ান্ত বিস্ময় জাগছিল , ঠিক দেখছি তো! যে কোনো উপায়ে জিততে চাওয়া অজি জাত্যাভিমান আজ তাঁদের পেশাদারি বর্ম খুলে ফেলে ক্রিকেটীয় ন্যায়বিচারকের ওভারকোট পরে ফেলল নাকি! মেলবোর্নের উলটপুরানে বোধহয় কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। নাহলে দূরন্ত ঘুর্নির দেশ থেকে আগত তিন পেস বোলার এমসিজির বাইশ গজে এভাবে গতির স্টিম রোলার চালাবে কেন? বুমরা-ইশান্ত-সামির পেস ত্রয়ী কেনই বা ভেঙে দেবে এক বছরে সর্বাধিক উইকেট নেওয়ার বিশ্বত্রাস সৃষ্টিকারী মার্শাল-হোল্ডিং-গার্নারদের রেকর্ড। চিরকাল উপমহাদেশের টিমগুলোর জন্য বরাদ্দ গতি আর বাউন্সের তেতো ওষুধ কেনই বা এভাবে গিলতে হবে ক্যাঙ্গারু বাহিনীকে। পরিবর্তিত নবভারতের টেমপ্লেট হয়তো এটাই। বিদেশে গিয়ে গতির গন্ধমাদন মাথায় নিয়ে কুঁকড়ে থাকা নয় , পেস ব্যাটারির বিশল্যকরনী দিয়ে তার যোগ্য প্রত্যাঘাত। ঘরের বাইরে টেস্ট জয়ের রহস্যভেদ তাঁরা করে ফেলেছেন। এসব দেখেশুনে শার্লক হোমস হলে নিশ্চয়ই বলতেন “এলিমেন্টারি মাই ডিয়ার ওয়াটসন!” থুড়ি টিম ইন্ডিয়া!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here