চেনা মঞ্চে আবারো কী পুরোনো অস্ট্রেলিয়া?

0
89

১৯৭৫,১৯৭৯,১৯৮৩,১৯৯৯ সালের পর পঞ্চমবারের মত ওয়ার্ল্ড কাপ ফিরছে হোম অফ ক্রিকেট খ্যাত ইংল্যান্ডে। গতবারের থেকে এবারের ওয়ার্ল্ড কাপে পরিবর্তন এসেছে অনেক। দলগুলোর শক্তিমত্তায়ও এসেছে পরিবর্তন। দশ দলের এ টুর্নামেন্টে প্রতিটি দলই শক্তিতে কেউ কারো থেকে খুব একটা পিছিয়ে নেই।

ওয়ার্ল্ড কাপ ফেভারিট হিসেবে শুধুমাত্র একটা টিমের নাম বলার উপায় নেই কারো। বর্তমান ফর্ম,শক্তি আর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাকিদলগুলোর তুলনায় তুলনামূলক কম ফেভারিট বা আন্ডারডগ হিসেবেই এবারের ওয়ার্ল্ড কাপ শুরু করছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া। তেমন কোন ক্রিকেট পন্ডিতই এবারের ফেভারিটের তালিকায় অস্ট্রেলিয়াকে রাখেনি। এর কারণ ২০১৮ সালে মাত্র ২টি ওয়ানডে জয় করা দল ওয়ার্ল্ড কাপ জিতবে এমন আশা খোদ অস্ট্রেলিয়ানরাও করেনি।

টেম্পারিং কান্ডে স্মিথ,ওয়ারনার ১ বছর নিষিদ্ধ থাকায় অনেক পরিবর্তন এসেছে দলে। খাজা,হ্যান্ডসকম্ব,রিচারডসনের মত তরুণরা দলে সুযোগ পেয়েছে। এর ফল দেরিতে হলেও পেয়েছে ৫ বারের চ্যাম্পিয়নরা। বছরের শুরুতেই দ্বিতীয় সারির দল নিয়ে ভারতকে ওদের মাটিতেই হারিয়েছে অজিরা। তারপর পাকিস্তানকে ৫-০ তে উড়িয়ে দিয়ে যেন অস্ট্রেলিয়া বার্তা দিয়ে রাখল সবচাইতে সফল দল তারা। ক্রিকেট পন্ডিতদের থোড়ায় কেয়ার করি আমরা।

স্মিথ,ওয়ারনারকে নিয়েই ওয়ার্ল্ড কাপের দল ঘোষণা করেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। দুর্দান্ত ফর্মে থেকেও যায়গা হয়নি পিটার হ্যান্ডসকম্বের। আর তাই বিতর্ক উঠেছে অজিদের মধ্যেই। ১ বছর পর দলে ফেরা স্মিথ,ওয়ারনারদের জন্য তরুণ হ্যান্ডসকম্বকে বাদ দেয়া উচিৎ হয়নি। তবে ওয়ার্ল্ড কাপ জয়ী এই দুই তারকা নিষিদ্ধের সময় পুরো ওয়ার্ল্ড এর ফ্রাঞ্চাইজি লিগ দাপিয়ে বেড়িয়েছে। আর তাই তাদের অন্তর্ভুক্ত করতে দুবার ভাবেনি সিএ। তবে স্মিথ,ওয়ারনার ফেরার পরেও বাকি দল গুলো আর নিজেদেরই গত ওয়ার্ল্ড কাপের টিমের তুলনায় এই দল বেশ দুর্বল।

এবারের টুর্নামেন্ট দশ দলের হওয়ায় প্রতি দলই একে অপরের বিপক্ষে লড়বে। প্রতি দলের ম্যাচ হচ্ছে এজন্য ৯টি করে। আর এজন্য সহজ প্রতিপক্ষ নেই একটিও। আফগানিস্তান কদিন আগে এশিয়া কাপে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার মত বড় দলকে হারিয়ে তাদের শক্তিমত্তার প্রমাণ আগেই দিয়েছে। অজিদের প্রথম ম্যাচ আফগানদের সাথেই। আর তাই অজি মিডিল অর্ডার রশিদ, নবী,মুজিবদের মত ওয়ার্ল্ড ক্লাস স্পিনারদের বিপক্ষে ভাল করতে না পারলে পা হড়কানো লাগতে পারে প্রথমেই। ২য় ম্যাচ উইন্ডিজদের সাথে। গেইল,হেটমায়ার,হোপ,রাসেলরা নিজেদের দিনে যে কোন টিমকে উড়িয়ে দিতে পারে। তবে স্টারক,কামিন্স,জাম্পা,লায়ন সমৃদ্ধ শক্তিশালী বোলিং থাকায়। উইন্ডিজ বাধা পার হওয়া হয়তো কষ্ট হবেনা। পরের ম্যাচেই ধরতে গেলে ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালের এক প্রস্থ মহড়া হয়ে যেতে পারে শিরোপা প্রত্যাশী ভারতের সাথে। আর শক্তিশালী ভারত বাধা পার হতে পারলে তা নিঃসন্দেহে অজিদের টুর্নামেন্ট পরবর্তীতে সাহস যোগাবে। পরের ম্যাচে আনপ্রেডিক্টেবল পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে অজিরা। নামের মতোই খেলে এই দল। নিজেদের দিনে যে কাউকে হারানোর ক্ষমতা রাখে এই দল। সাথে গত ওয়ার্ল্ড কাপে ওয়াহাব রিয়াজের ওয়াটসনের বিপক্ষে সেই স্পেল কে না ভুলতে পেরেছে? আর তাই এই দলের বিপক্ষে সাবধানী হতে চাইবে ফিঞ্চ বাহিনী। পরের ম্যাচে অপেক্ষাকৃত দুর্বল শ্রীলঙ্কার মুখোমুখি হবে অস্ট্রেলিয়া।

৯৬ তে ওয়ার্ল্ড কাপ আর ০৭,১১ পরপর দুবার ফাইনাল খেলা শ্রীলঙ্কা এখন আফগান দের সাথেও বড় ব্যাবধানে হারে। আর তাই খুব বড় পরীক্ষা হয়ত অজিরা পাবেনা। পরের ম্যাচ গত ওয়ার্ল্ড কাপে প্রথম কোয়ার্টার ফাইনাল খেলা বাংলাদেশের সাথে। সাম্প্রতিক সময়ে যাদের পারফরমেন্স যথেষ্ট ভাল। আয়ারল্যান্ড এ অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজ এ ফাইনাল গেরো কাটিয়ে প্রথমবারের মত শিরোপা যেতে বাংলাদেশ। এমনকি এবারের ওয়ার্ল্ড কাপে অজিদের চাইতে অভিজ্ঞতা বেশি বাংলাদেশের। আর তাই জিত্তে হলে বেশ বেগই পেতে হতে পারে অজিদের। তবে কার্ডিফের সেই ঐতিহাসিক হার ছাড়া আর কোন বাজে স্মৃতি না থাকায় ইতিহাস ভেবে স্বস্তি পেতে পারে অজিরা।

অজিদের সবচাইতে বড় আর চ্যালেঞ্জিং ম্যাচ হতে যাচ্ছে পরের ম্যাচে স্বাগতিক ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। যারা এবারের ওয়ার্ল্ড কাপে হট ফেভারিট। সাম্প্রতিক সময়ে যাদের বিপক্ষে বেশ ভুগেছে অস্ট্রেলিয়া। ২০১৫ সালে বাংলাদেশের কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকে বাদ পড়া ইংল্যান্ড সীমিত ওভারের ক্রিকেটকেই বদলে দিয়েছে। সদ্য সমাপ্ত পাকিস্তান সিরিজে ৩বার ৩৫০+ চেজ করে জিতেছে মরগান বাহিনী। আর তাই স্টারক,কামিন্সদের বড় পরীক্ষাই নিতে চলেছে ইংল্যান্ড এর শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপ।

অজিরা এখানেও ইতিহাস থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারে। ইংলিশদের বিপক্ষে গত ওয়ার্ল্ড কাপে প্রথম ম্যাচে জয় দিয়েই শুরু করেছিল অজিরা। তাই গতবারের স্মৃতি ফেরাতে হলে সামর্থের সবটুকু দিতে হবে অজিদের। অজিদের শেষ দুই ম্যাচ নিউজিল্যান্ড আর আফ্রিকার সাথে। ঐতিহাসিক ভাবে যাদের বিপক্ষে সাফল্য পেয়েছে অজিরা। আর তাই কম চিন্তিত থাকার কথা এই দুম্যাচ নিয়ে ল্যাঙ্গার বাহিনীর। আর গ্রুপ পর্বের বাধা পেরিয়ে সেমিতে উঠলে ফাইনালে ওঠা নিশ্চিতই বলা যায়। কেননা সেমিতে কখনো হারেনি অজিরা। আর সেক্ষেত্রে হয়ত ৬ষ্ঠ ওয়ার্ল্ড কাপ পেতে খুব বেশি অপেক্ষা করা লাগবেনা অজিদের।

অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ দল

অ্যারন ফিঞ্চ (অধিনায়ক),উসমান খাওয়াজা, জেসন বেহেনডেরফ, অ্যালেক্স ক্যারি (উইকেটকিপার), ন্যাথান কাটার-নাইল, শন মার্শ, গ্লেন ম্যাক্সওয়েল, নাথান লায়ন, ঝাই রিচার্ডসন, স্টিভ স্মিথ, ডেভিড ওয়ার্নার, মিচেল স্টার্ক, মার্কাস স্টয়নিক্স, প্যাট কামিন্স ও অ্যাডাম জাম্পা।

স্টিভ স্মিথ

বল টেম্পারিং কান্ডে নিষিদ্ধ হবার আগে অস্ট্রেলিয়ার সেরা টেস্ট ও ওয়ান্ডে ব্যাটসম্যান ছিলেন স্মিথ। ব্যান পরবর্তী সময়েও একিরকম ফর্মেই আছেন তিনি। প্রস্তুতি ম্যাচে ইংল্যান্ডের সাথে সেঞ্চুরি করে জানান দিয়েছেন মরচে ধরেনি তার ব্যাটে। গত ওয়ার্ল্ড কাপে টানা তিন ৫০+ করেন যথাক্রমে কোয়ার্টার, সেমি আর ফাইনালে। যার ফলে পঞ্চম ওয়ার্ল্ড কাপ অনায়াসেই জিতে অস্ট্রেলিয়া। আর তাই এবারের ওয়ার্ল্ড কাপেও অজিদের ভরসার প্রতীক হবেন স্মিথই।

ডেভিড ওয়ারনার

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে কোন ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ ছাড়ায় ওয়ারনারের অভিষেক হয় জাতীয় দলে। পরবর্তীতে তার বিদ্ধংসী ব্যাটিংয়ে তিনি জানান দিয়েছেন কেন কোন ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ ছাড়াই সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। সদ্য সমাপ্ত আইপিএলে অরেঞ্জ কাপ হোল্ডার ছিলেন তিনি। গত ওয়ার্ল্ড কাপে অজিদের ট্রাম্প কার্ড ছিলেন ওয়ারনার। তাই এবারো তিনিই থাকবেন গুরু দায়িত্বে।

মিচেল স্টারক

গত ওয়ার্ল্ড কাপে ২২ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্ট সেরা হয়েছিলেন মিচেল স্টারক। অকল্যান্ডে নিউজিল্যান্ড এর বিপক্ষে গ্রুপ পরবের ম্যাচে ৬ উইকেট নিয়ে একাই ম্যাচ প্রায় জিতিয়ে দেয়া পারফরমেন্স এর কথা কম লোকই ভুলতে পেরেছে। সাম্প্রতিক সময়ে চোট ভোগালেও। নিউজিল্যান্ডের সাথে প্রস্তুতি ম্যাচে ১৫০+ গতিতে সুইং করিয়ে সাথে তার চিরচেনা ইওরর্কারে বুঝিয়েছেন। এখনো সেরাদের কাতারেই আছেন। তাই এই ব্যাটিং বান্ধব ওয়ার্ল্ড কাপে স্টারক খুবি গুরুত্ব পুরণ অজিদের কাপ ডিফেন্সে।

লিখেছেন: টিপু সুলতান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here