এক রাজা ও তার রাজত্বের গল্প

0
92

বর্তমান প্রজন্মের এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া মুশকিল যে লিওনেল মেসিকে চিনে না। ফুটবল জগতের অন্যতম সেরা এই আক্রমনভাগের ফুটবলার আজ বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়। সেই রোজারিও শহর থেকে উঠে আসা এই ছোট মেসি পুরো বিশ্বফুটবলকে নিজের রাজত্ব বানিয়ে নিয়েছেন। যার নাম ফুটবলইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে সবসময়। ৩২ বছর বয়সে পা দিয়েছেন আর কয়েক মৌসুম হয়তো নিজের এই দক্ষতা বা সেরা খেলা খেলে যাবেন এরপরই তুলে রাখবেন নিজের ভালোবাসার বুট জোড়াগুলো আর হাজারো ভক্তকে কাঁদিয়ে বিদায় জানাবেন নিজের ভালোবাসার ফুটবলকে। আজই ৩২ এ পা দিয়েছেন তিনি। যার গল্প শুরু ২৪ জুন ১৯৮৭ সালে #রোজারিও (আর্জেন্টিনা) ২৪জুন ১৯৮৭: হোর্হে মেসি এবং সেলিয়া কুচেত্তিনির সুখের সংসারে তৃতীয়সন্তান হিসেবে জম্ম নেন লিওনেল আন্দ্রেস লিও মেসিকুচ্চিত্তিনি। বাবা ছিলেন ইস্পাতের কারখানার কর্মী এবং মা ছিলেন খন্ডকালীন পরিচ্ছন্নতার কর্মী। মেসি ছাড়াও তার দুই বড়ভাই এবং একটি বোন রয়েছে। মেসি মাত্র ৫ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব গ্রান্দ্রোলির হয়ে ফুটবল চর্চা শুরু করেন।১৯৯৫ সালের দিকে রোজারিও ক্লাব নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে যোগ দেন মেসি। কিন্তু১১বছর বয়সেই তার একটি সমস্যা ধরা পড়ে। গ্রোথ হরমোন সমস্যা দেখা দেয় মেসির। ডাক্তার বলেছিলো সে হয়তো আর বড় হবে না। মেসিকে নিয়ে বিপাকে পড়েন তার মা-বাবা। এই দিকে অনেক ক্লাব তাকে নিতে আগ্রহী হলেও তার চিকিৎসার ভারনিতে কেউ রাজি ছিলো না।

টার্নিং পয়েন্ট অফ মেসি

কার্লোস রেক্সাস হলেন বার্সালোনার সাবেকখেলোয়াড় ও কোচ।একটি সময় বার্সালোনার স্কাউট এর দায়িত্বে ছিলেন তিনি।প্রতিভার খোঁজে বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানো কার্লোস চলে গেলেন ম্যারডোনার দেশ আর্জেন্টিনাতে।আর্জেন্টিনার অনেক বড় বড় ক্লাবের একাডেমি খুঁজে মনের মত কোনোখেলোয়াড় খুঁজে পাচ্ছিলেন না কার্লোস।এমন খেলোয়াড় খুঁজছিলেন তিনি যাকেদেখে সবাই অবাক হয়ে যাবে। নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের মাঠে পাড়ি জমালেন এই কর্তা। দেখতে লাগলেন সবার খেলা এবং হঠাৎ চোখ আটকে গেলো এক ছোট ছেলের দিকে।মাঠের সবচেয়ে ছোটখাটো, সবচেয়ে দূর্বল ছেলেটি একের পর এক খেলোয়াড়কে কাটিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন যার পায়ে একবার বল গেলে তার থেকে তা নেওয়াই যাচ্ছে না।মেসির প্রতিভা দেখে মুগ্ধ বার্সালোনা থেকে আসা এই কর্তা।তাই সরাসরি চলে গেলেন তার বাবা-মার কাছে।কিন্তু সেখানেই জানতে পারেন মেসির সমস্যার কথা।এক দুঃশ্চিন্তা নিয়ে পাড়ি জমালেন স্পেনে।বার্সালোনার পরিচালকদের নিয়ে বসলেন মেসিকে নিয়ে কথা বলতে।তারাও রাজি ছিলো না মেসির চিকিৎসার খরচ বহন করতে। অবশেষেরাজি করানো হয় বার্সালোনার পরিচালকদের। ২০০০ সালেরদিকে মেসিকে বার্সালোনাতে সাইন করানোর হয়। কে জানতো বার্সালোনার ইতিহাসের সেরা সাইনিং হয়ে থাকবে এটি।

বার্সালোনায় পথচলা শুরু (২০০০-২০০৩)

২০০০ সালে সাইনিং এর পর নিজের ফুটবল শিল্পকে আরো দক্ষ করে তুলতে শুরু করেন মেসি।
মেসির জন্য তার বাবা মাও স্পেনে পাড়ি জমিয়েছিলো।লা মাসেয়াতে বেড়ে উঠছিলো বিশ্বফুটবলের তারকা মেসি। তিনি বার্সালোনার হয়ে ইনফান্তিন বি, কাদেতে বি এবং কাদেতে এ দলেও খেলেছেন। হঠাৎ বার্সালোনার আর্থিক সমস্যা দেখা দেয় এবং তখন তারা তাদেরপ্রতিভাবান ফুটবলার মেসিকে ছেড়ে দিতে রাজি হয়ে যায়।কিন্তু একাডেমির কর্তারা কোনোভাবেই তাকে ছাড়তে রাজি হয় নি। শেষে স্প্যানিশ  মিডফিল্ডার সেস ফ্যাব্রিগাসকে ছেড়ে মেসিকে দলে রাখা হয়।২০০৩-০৪ মৌসুমে মেসি ৫টা আলাদা দলের হয়ে খেলেন।২০০৩সালে ২৯ অক্টোবর বার্সালোনা সি এবং ২০০৪ সালে ৬ মার্চ বার্সালোনা বি দলের হয়ে অভিষেক হয় মেসির। এই দলগুলোরহয়ে অভিষেক হওয়ার আগেই  মেসির মূল দলের হয়ে অভিষেকহয়ে যায়।২০০৩ সালে ১৬ নভেম্বর পোর্তোর সাথে একটি প্রীতি ম্যাচে বার্সালোনার জার্সি পরে নামেন ১৬ বছর বয়সী মেসি।

রাজার রাজত্বের শুরু

এই গল্পের রাজা মেসির রাজত্ব শুরু হয়৷ ২০০৫ সালে। তখন বার্সালোনা মেসির সাথে নিজেদের চুক্তি নবায়ন করে এবং স্পেনের জাতীয়ত্ব প্রদান করে। সাথে তাকে মূল দলে নিয়ে নেয়।২৭ সেপ্টেম্বর মেসি নূ ক্যাম্পে ইতালিয়ান ক্লাব উদিনেসের বিপক্ষে মাঠে নেমে নিজের মৌসুম শুরু করেন। এই মৌসুমে পেশি ছিড়ে যাওয়া মৌসুমের ইতি টানতে হয় তাকে। লা-লীগায় এই মৌসুমে ১৭ ম্যাচ খেলে ৬টি গোল করেছিলেন তিনি।২০০৬-০৭ মৌসুমে বার্সালোনার নিয়মিত খেলোয়াড় হয়ে উঠেন মেসি। সেই বছরের এল-ক্লাসিকোতে নিজের আগমনী বার্তা ছড়িয়ে দেন এই ক্ষুদে জাদুকর। শক্তিশালী রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে এল-ক্লাসিকোতে হ্যাট্রিক করেন লিওলেন মেসি। তিনবার বার্সালোনা পিছিয়ে পড়লেও মেসির কল্যানে ম্যাচটি ড্র করে বার্সালোনা। তখনকার মিডিয়া মেসিকে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় ম্যারাডনা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।২০০৭-০৮ মৌসুমে মার্কা একটি জরিপ করে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচনের জন্য আর সেখানে ৭৭ শতাংশ ভোট পেয়ে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন লিওলেন মেসি। ২০০৭ সালে ব্যালনডি’অর পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হন তিনি।সেরা তিনজনের মধ্যে ছিলেন। কাকা সেবার ব্যালন ডি’অর জিতেন মেসি হয়েছিলেন ৩য় আর রোনালদো হয়েছিলেন ২য়। ফিফা বর্ষসেরাখেলোয়াড়ও নির্বাচিত হন কাকা। মেসি হয়েছিলেন ২য়। নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম তিনটি মৌসুমে ৪টি ইনজুরিতে পড়েন মেসি।২০০৮-০৯ সালে ব্রাজিলের রোনালদিনহো বার্সালোনা ছাড়েন আর তার রেখে যাওয়া ১০ নাম্বার জার্সি উঠে মেসির গায়ে।২০০৮-০৯ মৌসুম থেকেই ফুটবলের রাজা হয়ে উঠেন তিনি।প্রথমবারের মত জিতে নেন ফিফা বর্ষসেরার ফুটবলারের পুরস্কার।এই মৌসুমে মেসি ৩৮ গোল করেন এবং ১৮টি গোল করতে সহায়তা করেন। ২০০৯-১০ মৌসুমে তখনকার কোচ পেপগার্দিওয়লার অধীনে আরো মারাত্মক হয়ে উঠেন মেসি। সেই মৌসুম শেষে মোট ৪৮ গোল করেন এই আর্জেন্টাইন। ২০১০-১১মৌসু্মে সব ধরনের প্রতিযোগীতা মিলিয়ে ৫৩গোল করেন তিনি।এইভাবে এগিয়ে যেতে থাকেন মেসি। ২০১১-১২ মৌসুমে সবধরনের প্রতিযোগীতা মিলেয়ে করেন ৭৩ গোল। ২০১২-১৩মৌসুমে করেন ৬০ গোল। ২০১৩-১৪ মৌসুমে করেন ৪১ গোল।২০১৪-১৫ মৌসুমে করেন ৫৮ গোল। ২০১৫-১৬ মৌসুমে করেন৪১ গোল। ২০১৬-১৭ মৌসুমে করেন ৫৪ গোল। ২০১৭-১৮মৌসুমে ৪৫ গোল। আর সর্বশেষ মৌসুমে করেন ৩৩ গোল।


রাজার যত পুরস্কার

২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে আর্জেন্টিটাকে একাই টেনে তুলেন মেসি। কিন্তু ফাইনালে হেরে বসে তারা। তারপরও ২০১৪ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন মেসি। এছাড়া ফিফা ব্যালন ডি অর জিতেন ৫বার। সালগুলো হলো ২০০৯,২০১০,২০১১,২০১২ এবং ২০১৫।যার মধ্যে টানা চারবার জিতেন তিনি। ফিফা বর্ষসেরা খেলোয়াড় হন একবার ২০০৯ সালে। ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জিতেন ৫ বার। সালগুলো হলো ২০১০,২০১২,২০১৩,২০১৭ এবং ২০১৮। উয়েফা ইউরোপীয়ান সেরা খেলোয়ার হন ২০১১ এবং ২০১৫ সালে। এইভাবে তার ব্যক্তিগত প্রায় ৪৩টির মত অর্জন রয়েছে। আর রের্কডের সমাহার নিয়ে বসে আছেন এই তারকা। সর্বোচ্চ ফিফা ব্যালন ডি’অর জয়ের রের্কড আছে তার(রোনালদোর সমান)। এক বছরের সবচেয়ে বেশি গোলের রের্কড আছে তার যা গিনেস বিশ্ব রের্কড।২০১২ সালে ৯১টি গোল। জাতীয় দলের হয়ে সর্বকালের  সেরা গোলদাতা তিনি। ৬১ গোল দিয়ে সবার উপরে আছেন। সর্বাধিক লা-লীগা সেরা খেলোয়াড় হওয়ার পুরস্কার আছে তার ১১বার।এইভাবে প্রায় ৪০টির ও বেশি রের্কড রয়েছে তার। বার্সালোনার হয়ে ৯টি লা-লীগা, ৬টি কোপা ডেল রে জিতেছেন।চ্যাম্পিয়ন্সলীগ জিতেছেন ৪বার। ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ আছে ৩টি। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ফুটবলারও লিওলেন মেসি।

ব্যক্তিগত জীবন

বিয়ে করেছেন নিজের দীর্ঘকালের বান্ধবী আন্তোনেল্লারক্কু্জ্জোকে। তাদের দীর্ঘদিনের সর্ম্পক ছিলো। তাদের ৩টি ছেলেসন্তান আছে। ২০১২ সালে নভেম্বরে। তাদের ঘরে তাদের প্রথমসন্তান আসে। এরপর আরো দুটি সন্তান হয় তাদের। নিজেদের প্রেমকে তারা অনেক পরেই বিবাহে পরিনত করেন।

অন্যজীবনের মেসি

২০০৭ সালে মেসি প্রতিষ্ঠিত করেন লিও মেসি ফাউন্ডেশন।এইসংস্থার কাজ হচ্ছে সুরক্ষিত নয় এমন শিশুদের নিয়ে কাজ করা।এছাড়া রোগী শিশুদের চিকিৎসা দেওয়ার ও কাজ করে এইসংস্থা। ২০১০ সালে ইউনিসেফের শুভেচ্ছা দূত ঘোষনা করা হয় মেসিকে। সাথে বার্সালোনাও ইউনিসেফের সাথে বিভিন্ন কর্মকান্ডে জড়িতো। শিশুদের অধিকার রক্ষায় মেসি অনেকদিন ধরেই কাজকরে যাচ্ছেন। ২০১০ সাল থেকেই বিশ্বের ধনী ফুটবলাদের মধ্যেশীর্ষে রয়েছেন। প্রায় ১১০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের সম্পত্তি আছে এই আর্জেন্টাইনের। সবশেষ ১২মাসে তার আয় ৬৫ মিলিয়ন।পারিশ্রমিক ও সবার চেয়ে বেশি পান লিওলেন মেসি। ২০১৫পযর্ন্ত চুক্তিতে তার বেতন ছিলো ১৬ মিলিয়ন ইউরো। এছাড়াওবিভিন্ন মিডিয়া কার্যক্রমের সাথে আছেন এই খেলোয়াড়।  এই রাজার গল্প হয়তো এইভাবে আরো কিছু মৌসুম চলবে। খুদে জাদুকরের জাদু দেখবে এই বিশ্ব ফুটবলপ্রেমীরা। যারা হয়তো সারাজীবন মনে রাখবে আর্জেন্টিনার রোজারিও থেকে উঠেআসা এই বিশ্ব  ফুটবলের তারকাকে।

শুভ জম্মদিন মেসি

লেখক- সাঈদ ইবনে সামস

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here