উৎসব বিমুখ বিপন্ন অস্ট্রেলিয়া , ইতিহাসে চোখ বিরাটদের

0
462

কলকাতা প্রতিনিধিঃ  সিডনি পৃথিবীর সেই সব বিরল শহরগুলোর মধ্যে একটা যেখানে বর্ষবরনের রাতে আতসবাজির প্রদর্শনী দেখার জন্য বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ভিড় জমায় অতুৎসাহি জনতা।

সময়ের তারতম্যের কারনে পৃথিবীর এই গোলার্ধের মানুষজন সবার আগে বরন করে নেয় নতুন বছরকে। সোমবার রাতে এই বর্ষবরনের আবহকে আরও বর্ণময় করে তোলার ভার যেন প্রকৃতিই নিয়ে নিয়েছিল।

বিকেল থেকে সন্ধ্যে নামতেই আকাশ কালো করা মেঘ সঙ্গে বর্জ্র্যবিদ্যুৎ সহ বৃষ্টিপাত। কৃত্রিম আতসবাজি নয় , যেন প্রকৃতির আতসবাজিতে তখন রোশনাই সিডনির আকাশ। অবশ্য এই দুর্যোগেও সিডনিবাসীর উৎসবের আমেজে কোনো ভাটা পড়েছে বলে মনে হল না। প্রকৃতির সাময়িক খামখেয়ালিপনায় কিছুটা ব্যাহত হলেও দূর্যোগ কাটতেই সিডনি অপেরা হাউস ও হারবার ব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় আবার জনস্রোত।

গেল বছরেরই মাঝ ডিসেম্বরে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেছে সিডনি। ঘুর্নিঝড় ওয়েনের দাপটে নিউ সাউথ ওয়েলস্ , কুইন্সল্যান্ডের মতো রাজ্যের বেশ কিছু অংশ লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছে। অভিশপ্ত সেই বিপর্যয়ের রেশ সিডনি ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠলেও টিম পেইনদের দেখে মনে হল না কয়েকদিন আগের মেলবোর্ন বিপর্যয়ের ধাক্কা তাঁরা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন বলে।

নাহলে কেনই বা নতুন বছরের প্রথম দিন , ছুটির দিন ঘন্টার পর ঘন্টা এসসিজির নেটে পড়ে থাকবেন পেইন-ফিঞ্চরা। অজি শিবিরের এদিন অপশনাল প্র্যাকটিস ছিল তাই সকলে এদিন মাঠে আসেননি। তবে ফিঞ্চ-মার্শ-পেইনদের মতো জনাসাতেক অস্ট্রেলীয়কে এদিন দেখা গেল নেটে ঘাম ঝরাতে। অজিদের এই চূড়ান্ত উৎসব বিমুখতা দেখেশুনে মনে হচ্ছে এখন যেন ঘুমের মধ্যেও দুঃস্বপ্নের মতো ইশান্ত-সামি-বুমরারা পেইনদের মনোজগতে ক্রমাগত হানা দিচ্ছে।

ক্যাঙ্গারু বাহিনীর এই দুঃস্বপ্ন ভাঙ্গানোর টোটকা হিসেবে ২৪ বছরের এক অলরাউন্ডারকে এদিন দেখা গেল অজিদের নেটে। নাম মার্নাস লাবুসচেঞ্জ। শোনা গেল দক্ষিন আফ্রিকাজাত এই অস্ট্রেলীয় আদতে লেগ স্পিনার তবে প্রয়োজনে টপ অর্ডার ব্যাটিংও করেন। মনে হল অনামী স্পিনারদের সামনে হঠাৎ হঠাৎ ভারতের অসহায় আত্মসমর্পনের করুন ইতিহাসে যেন চোখ বুলিয়েই সিডনিতে বিরাটদের সামনে ফাটকা হিসেবে লাবুসচেঞ্জকে তৈরি রাখা হচ্ছে। এদিন নেটে তিনি ক্রমাগত যে ভদ্রলোককে বল করে গেলেন তার অবশ্য সিডনিতে নামার সম্ভাবনা ডিসেম্বরের সিডনিতে তুষারপাতের মতোই অলীক , অবাস্তব। তিনি অ্যারন ফিঞ্চ। স্টিভ ওয়া থেকে রিকি পন্টিংয়ের মতো অজি মহাতারকারা একযোগে আওয়াজ তুলেছেন ফিঞ্চকে ছাঁটাইয়ের পক্ষে।

নিজভূমে পরবাসী এই অস্ট্রেলীয় টিমকে দেখে মনে করতে পারা গেল না উপমহাদেশীয় কোনো দলের সামনে শেষ কবে এদের শিরদাঁড়া দিয়ে এতোটা হিমস্রোত নেমে গ্যাছে। ঠিক তেমনই বিরাটদের দেখে মেলানো যাচ্ছে না সিডনিতে শেষ কবে কোনো ভারতীয় টিমকে এতোটা ফুরফুরে চাপমুক্ত দেখিয়েছে।

এমনিতে এসসিজি অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটকূলের মধ্যে সেই মাঠ যেখানে উপমহাদেশের টিমগুলোর জন্য সামান্য হলেও দয়া দাক্ষিন্য বরাদ্দ থাকে। দ্বিতীয়-তৃতীয় দিনের পর থেকে বাইশ গজ স্পিনার সহায়ক হয়ে ওঠে বলে ভারত চিরকালই এখানে ভালো খেলে। অজিদের মতো বিরাটদেরও এদিন অপশনাল প্র্যাকটিস ছিল। তবু ফিট হতে মরিয়া অশ্বিনকে দেখা গেল এসসিজি ইন্ডোরে ফিজিও প্যাট্রিক ফারহার্ট ও ট্রেনার শঙ্কর বসুকে নিয়ে পড়ে রয়েছেন। শোনা গেল অশ্বিনের ফিটনেস সমন্ধে চূড়ান্ত নিশ্চিত না হয়ে তাঁকে টিমে ফেরানোর কথা ভাবছে না ভারতীয় থিঙ্ক ট্যাঙ্ক। সেক্ষেত্রে কাল ম্যাচের দিন সকালে আবার তাঁর ফিটনেস পরীক্ষা নেওয়া হবে।

এমনিতে বাবা হওয়ায় রোহিত দেশে ফিরে যাওয়ায় মেলবোর্ন টেস্টের ভারতীয় দল থেকে একটা পরিবর্তন হচ্ছেই। রোহিতের এই আনন্দ সংবাদ আর এক জনের জীবনেও খুশির লাভাস্রোত বইয়ে দিতে পারে , তিনি কেএল রাহুল। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে কাল এসসিজিতে ময়াঙ্কের সঙ্গে ওপেন করতে নামবেন রাহুলই। ভারতীয় টিম ম্যানেজমেন্টের গরিষ্ঠ অংশের মত হল রাহুল চূড়ান্ত প্রতিভাবান , বয়সটাও কম তাই আরও কিছু সুযোগ তাঁর প্রাপ্য। তবে বিজয়কে নিয়ে সেরকম কোনো আশার কথা শোনা যাচ্ছে না। বিরাট কোনো অঘটন না ঘটলে বিজয়ের নামের পাশে বোধহয় এখনই ‘প্রাক্তন’ লিখে দেওয়া যায়। মেলবোর্নে ওপেন করে ব্যর্থ হনুমা বিহারী কাল ফের ফিরে আসছেন ছয় নম্বরে। নির্বাচক প্রধান এমএসকে প্রসাদ তাঁকে আশ্বস্তই করেছিলেন ওপেনে না পারলে ফের তাঁকে মিডল অর্ডারে ফেরত আনা হবে।

তবে সিডনি টেস্টের ভারতীয় দল নিয়ে আসল ধাঁধাটির নিষ্পত্তি এদিনও হল না। দুই স্পিনার , দুই সিমার নাকি এক স্পিনার তিন সিমার? শোনা গেল অশ্বিন ফিট প্রমানিত হলে জাডেজার সঙ্গে  তিনিই খেলবেন , নাহলে বোলিং লাইন আপে সেরকম কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। লাল বলের ক্রিকেটে কুলদীপের ওপর বিশেষ একটা আস্থা নেই টিম ম্যানেজমেন্টের। কোনো কোনো মহল থেকে হার্দিক পান্ডিয়ার নামটাও ভেসে আসতে শোনা গেল। অশ্বিন না খেললে ব্যাটিংয়ের গভীরতা বাড়াতে ইশান্তের জায়গায় তিনিও দলে ঢুকে পড়তে পারেন। তাঁর পিছনে বড় যুক্তি হল ব্যাটের পাশাপাশি তিনি তৃতীয় সিমারের কাজটাও করে দিতে পারেন।

নববর্ষের প্রথম দিন এদিন ভারত-অস্ট্রেলিয়া দুটো টিমকেই আমন্ত্রন জানিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন কিরিবিলি হাউসে এদিন অনেকটাই চাপমুক্ত দেখাল বিরাট-শাস্ত্রীদের। মেলবোর্নে ঋষভ পন্থের সঙ্গে বাগযুগ্ধে জড়িয়েছিলেন টিম পেইন। স্লেজিংয়ের সময় ঋষভকে তাঁর বাচ্চাদের দেখভাল করার কথা বলেছিলেন পেইন। এদিন আদতেই দেখা গেল টিম পেইনের এক সন্তানকে কোলে নিয়ে হাসিমুখে পোজ দিচ্ছেন ঋষভ। এতো উৎসব সমারোহের বিপুলায়োজনের মধ্যেও বিরাটদের দেখে মনে হল ওপর ওপর তাঁরা যতই উৎসবের এই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসাক , ভিতরে ভিতরে ইতিহাস রচনাকেই যেন পাখির চোখ করে নিয়েছেন তাঁরা। প্রথম কোনো এশীয় দল হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটি থেকে টেস্ট সিরিজ জয়। নতুন বছরের উপহার স্বরুপ বিরাটদের কাছে আক্ষরিক অর্থেই ম্যাজিক বক্স নিয়ে সিডনির বাইশ গজ হাজির হবে কী না তা জানা যাবে আরও চব্বিশ ঘন্টা পর। তবে খোঁচা খাওয়া বাঘের মতো কোনো অস্ট্রেলীয় প্রত্যাঘাত বিরাটদের এই সুখের সংসারে হানা দেবে না তো? মনের মধ্যে অশনি সঙ্কেতের মতো এই একটা জিনিসই কেবল খোঁচা দিচ্ছে। প্রফেসর মরিয়াটির ধাক্কায় খাদ থেকে পড়ে যাওয়া শার্লককে তো সবাই মৃত বলেই ধরে নিয়েছিল। কে ভেবেছিল পরের গল্পেই কোনান ডয়েল শার্লকের এমন অত্যাশ্চর্য প্রত্যাবর্তন ঘটাবেন। তফাতের মধ্যে ওটা গল্প , এটা বাস্তব। তবে কথাতেই তো আছে কখনও কখনও বাস্তব কল্পনার চেয়েও রোমাঞ্চকর। বিরাটদের তাই সাবধান থাকতেই হবে। সাবধানের মার নেই

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here